রবিবার, ১৫ই মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বৈষম্য, গ্রেপ্তার, মৃত্যু ও যুদ্ধের নীরব ভুক্তভোগী বাংলাদেশিরা *** ইরানে আরও তিন সপ্তাহ হামলা চালাবে ইসরায়েল *** সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি ও বিরোধী দলের বাহাস *** ‘রাষ্ট্রপতি অস্তিত্বহীন সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে পারেন না’ *** ‘৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙার নির্দেশ কারা দিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার’ *** ডিজিএফআই–প্রধানের দিল্লি সফরে সম্পর্কের বরফ গলার আভাস *** ছারপোকা নির্মূলের সহজ সমাধান আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা *** যে কারণে হাদি হত্যার বিচারে বিলম্ব, জানালেন আসিফ নজরুল *** নাগরিকদের সৌদি আরব ছাড়তে বলল যুক্তরাষ্ট্র *** সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জামায়াত আমিরের বিতর্ক

সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি ও বিরোধী দলের বাহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:২৯ অপরাহ্ন, ১৫ই মার্চ ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ। কিন্তু এই পরিষদের সাংবিধানিক ভিত্তি আছে কি না—তা নিয়েই এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সমঝোতা ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কে কেন্দ্র করে সংবিধান সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ায় একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের ধারণা সামনে আসে। তবে বাস্তবে এ পরিষদের আইনি ভিত্তি এখনো পরিষ্কার নয়—এ কারণে এর অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের যে সময়সীমা ছিল, আজ রোববার তা শেষ হচ্ছে। কিন্তু আজ এই সভা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আগেই দেখা দেয়। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সরকারদলীয় জোট ও বিরোধীদলীয় জোটের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের আজকের অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিকে সামনে আনে বিরোধী দল। এতে প্রথম দিনের মতো আজও সংসদে উত্তাপ ছড়ান নেতারা।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ নেই। ফলে সংবিধানে সংশোধনী ছাড়া এমন কোনো পরিষদের অধিবেশন ডাকার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই।

আজ সংসদে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানে ‘রিফর্ম কাউন্সিল’ নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি যে অধিবেশন আহ্বান করেছেন তা জাতীয় সংসদের, কোনো সংস্কার পরিষদের নয়। তার মতে, এ ধরনের একটি পরিষদ গঠন করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে এবং সংসদের মাধ্যমেই তা করতে হবে।

আইনবিদদের মতে, সংবিধানে স্বীকৃতি না থাকলে রাষ্ট্রপতি কোনো নতুন সাংবিধানিক সংস্থা গঠন বা তার অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না। এজন্য সংসদে সাংবিধানিক সংশোধনী প্রয়োজন।

সংসদে সালাউদ্দিন–শফিকুর বাহাস

রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সরাসরি বাকবিতণ্ডা হয়। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডাকার কথা ছিল।

তিনি সংসদে প্রশ্ন তোলেন—“আজ নির্ধারিত সময়ের শেষ দিন। কিন্তু পরিষদের অধিবেশন এখনো ডাকা হয়নি—সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে?”

তার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানে যেহেতু এমন কোনো পরিষদের উল্লেখ নেই, তাই সংসদে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী ছাড়া এটি কার্যকর করা সম্ভব নয়।

সংস্কার প্রক্রিয়ার পটভূমি

২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। পরে বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রস্তাবিত হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি বিশেষ পরিষদ গঠনের ধারণা সামনে আসে।

২০২৬ সালের গণভোটে এই সংস্কারের প্রস্তাব সমর্থন পেলেও তা সরাসরি সংবিধান পরিবর্তন করে না; বরং সংসদের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়নের পথ তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মত

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে মূল দ্বন্দ্বটি রাজনৈতিক ও আইনি দুই স্তরেই। সংবিধানে উল্লেখ না থাকলে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ কার্যত অস্তিত্বহীন একটি কাঠামো। তবে গণভোট ও জাতীয় সনদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে।

তাদের মতে, এ কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সংসদের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হতে পারে—হয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিষদ গঠন করা হবে, অথবা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় সংস্কার বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, এখন এটি আর আদৌ রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারবে কি না সেটি নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুকে প্রাসঙ্গিক রেখে কতটা জিইয়ে রাখতে পারে তার ওপর।

তিনি বলেন, বিএনপি সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, বরং তারা সংবিধান সংশোধন বিল আনার কথা বলেছে। আমার মনে হয় বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার। তাদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ ছিল সংবিধান সংশোধন করা।

তিনি বলেন, বিএনপি সেটি সংবিধান সংশোধন বিলের মাধ্যমে করার পক্ষে। সুতরাং সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতপার্থক্য নেই। এখন দেখা যাক, সংবিধান সংস্কার পরিষদ করার বিষয়ে বিরোধী দল কতটা চাপ তৈরি করতে পারে।

সামনে কী?

সরকার বলছে, বিষয়টি সংসদেই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিরোধী দলও সংসদে বিস্তারিত বিতর্কের দাবি জানিয়েছে। ফলে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ আদৌ গঠিত হবে কি না—নাকি এটি রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—তা এখন নির্ভর করছে সংসদের সিদ্ধান্ত ও সম্ভাব্য সাংবিধানিক সংশোধনের ওপর।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি এখন শুধু আইনি নয়, বরং রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ও হয়ে উঠেছে। ফলে সংসদের ভেতরের বিতর্কই ঠিক করে দেবে—সংবিধান সংস্কারের জন্য আলাদা কোনো পরিষদ গঠিত হবে কি না, নাকি বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কারের পথ খোঁজা হবে।

সংবিধান সংস্কার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250