রবিবার, ১৫ই মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বৈষম্য, গ্রেপ্তার, মৃত্যু ও যুদ্ধের নীরব ভুক্তভোগী বাংলাদেশিরা *** ইরানে আরও তিন সপ্তাহ হামলা চালাবে ইসরায়েল *** সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি ও বিরোধী দলের বাহাস *** ‘রাষ্ট্রপতি অস্তিত্বহীন সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে পারেন না’ *** ‘৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙার নির্দেশ কারা দিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার’ *** ডিজিএফআই–প্রধানের দিল্লি সফরে সম্পর্কের বরফ গলার আভাস *** ছারপোকা নির্মূলের সহজ সমাধান আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা *** যে কারণে হাদি হত্যার বিচারে বিলম্ব, জানালেন আসিফ নজরুল *** নাগরিকদের সৌদি আরব ছাড়তে বলল যুক্তরাষ্ট্র *** সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জামায়াত আমিরের বিতর্ক

বৈষম্য, গ্রেপ্তার, মৃত্যু ও যুদ্ধের নীরব ভুক্তভোগী বাংলাদেশিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:৪৭ অপরাহ্ন, ১৫ই মার্চ ২০২৬

#

কাজের ফাঁকে একটি দেয়ালের ওপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা। গত বুধবার দুবাইয়ে। ছবি: এএফপি

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থানীয় অনেক বাসিন্দা নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরে অবস্থান করছেন। তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য চাহিদা বেড়েছে ডেলিভারি পরিষেবার। এ কাজে যুক্ত হয়ে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক সড়ক থেকে আরেক সড়কে ছুটছেন বাংলাদেশি, পাকিস্তানি কিংবা নেপালি প্রবাসী শ্রমিকেরা।

কিন্তু এমন কাজ করতে গিয়ে প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন। ইরানের পাল্টা হামলা শুরুর পরদিনই (১লা মার্চ) দুবাইয়ে এক বাংলাদেশি ডেলিভারি রাইডার বাইকে করে রাস্তায় ঘুরতে শুরু করেন। তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় সেদিন তার আয়ও ভালো হয়। কিন্তু সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে একের পর এক প্রবাসীদের মৃত্যুর খবর সামনে আসতে থাকে। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন (আজ রোববার পর্যন্ত ২০ জন, ৫ জন বাংলাদেশি)। তাদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহতদের সবাই বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও নেপালের নাগরিক। ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন ছিলেন বাংলাদেশের ৫৫ বছর বয়সী সালেহ আহমেদ। যুদ্ধের প্রথম দিন আমিরাতে পানি পৌঁছে দেওয়ার কাজ করার সময় তিনি প্রাণ হারান। 

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংস্থা একুইডেমের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কাদরি বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি এমন- কাতার ও আমিরাতের স্থানীয়রা জীবন বাঁচাতে ঘরে থাকছেন, অন্যদিকে প্রবাসীরা আয় করে জীবন বাঁচাতে রাস্তায় ছুটছেন।

কাদরি বলেন, তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সৌদি আরব, আমিরাত, কাতার ও জর্ডান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী শ্রমিকেরা বর্তমানে আতঙ্ক, মানসিক চাপ ও স্থানীয় সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মারাত্মক অবহেলার শিকার হচ্ছেন। 

অবহেলার ক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়ে মুস্তফা কাদরি বলেন, প্রথম সমস্যা হলো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সময় শ্রমিকেরা সরকারি সুরক্ষা বার্তা পান না। সরকারের কিছু কিছু বিবৃতিতে সব বাসিন্দাকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের শ্রমিকেরা বলছেন, আশ্রয়কেন্দ্র, নিরাপদে সরে যাওয়ার পথ বা জরুরি সহায়তা নিয়ে তারা কোনো কার্যকর নির্দেশনা পাননি।

দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে মুস্তফা কাদরি কাঠামোগত বৈষম্যর কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব দেশের নির্মাণ, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, ঘরের কাজে প্রবাসী শ্রমিকেরা অপরিহার্য কর্মী হিসেবে কাজ করেন। ফলে হামলার মধ্যেও অনেককে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। অনেক সময় তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার বদলে বিপদের দিকে এগোতে হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় কয়েকটি ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মে কাজ করা তিনজন রাইডারের সঙ্গে কথা বলেছে মিডল ইস্ট আই। তারা সবাই জানিয়েছেন, হামলার মধ্যেও কোনো নির্দেশনা, সহায়তা বা বিকল্প ছাড়াই তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। চাকরি রক্ষার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া এসব রাইডাররা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের কাজের চাপ বেড়েছে। 

দুই বছর ধরে রাইডারের কাজ করা এক বাংলাদেশি বলেন, প্রথম হামলার দিন রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা ছিল। কিন্তু পরের দিন থেকে তিনি আবার ডেলিভারিতে বের হন। তখন গ্রাহকরা আগের চেয়ে বেশি বকশিশ দেন।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে আবুধাবিতে থাকা এক পাকিস্তানি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর স্থানীয় অনেক বাসিন্দা ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। এ কারণে অর্ডারের পরিমাণও বেড়ে গেছে। তিনি এখন দিনরাত কাজ করছেন। বিশ্রামের জন্য খুবই কম সময় পাচ্ছেন।

দুবাইয়ে থাকা আরেক পাকিস্তানি বলেন, তিনি ১২ ঘণ্টা কমিশনভিত্তিক শিফটে কাজ করেন। ডেলিভারি পৌঁছে দিলেই কেবল টাকা পান। তাই কাজ বন্ধ করা তার পক্ষে অসম্ভব। 

এদিকে রাস্তায় থাকায় যেকোনো হামলার প্রত্যক্ষদর্শীও হচ্ছেন প্রবাসীরা। হামলার যেসব ভিডিও বা ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছে সেগুলোর বেশিরভাগই তাদের ধারণ করা। কিন্তু এজন্য তাদের আইনি জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। হামলার দৃশ্য ধারণ ও ইরানের প্রশংসা করায় চলতি সপ্তাহে বাহরাইন পাঁচজন পাকিস্তানি ও এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে। 

একুইডেমের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কাদরির আশঙ্কা, আরো অনেক প্রবাসী শ্রমিক গ্রেপ্তারের মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে আরব আমিরাতে তারা কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হতে পারেন। কারণ দেশটিতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো ঘটনার ভিডিও ধারণকারীদের জেলে পাঠানোর ইতিহাস আছে।

মুস্তফা কাদরি বলেন, এটা অনেকটা গাজার পরিস্থিতির মতো। সংঘাতের জায়গাগুলোতে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষরাই প্রত্যক্ষদর্শী হন। সুতরাং তাদের নির্যাতনের শিকার হওয়া উচিত নয়।

চলমান সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে প্রবাসী শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর দুর্বলতা। বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত কিংবা ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলো অনেক সময় তাদের নাগরিকদের যথাযথ কনস্যুলার সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়। এবারও তাই ঘটছে। কাদরির মতে, এখন পর্যন্ত এসব দেশের সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নয়।

প্রবাসী শ্রমিক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250