ফাইল ছবি
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার একটি সালিস বৈঠকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে অনলাইন জগতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালাকে উত্তেজিত কণ্ঠে উপস্থিত লোকজনকে ধমক দিতে এবং টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়। বিশেষ করে তার মুখ থেকে উচ্চারিত ‘সবগুলারে খাইয়া হালামু’ মন্তব্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ফেসবুক, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া প্রায় এক মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সালিস বৈঠকে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছিলেন। একপর্যায়ে সংসদ সদস্য হানজালা তাদের কথার মধ্যে বাধা দিয়ে চুপ থাকতে বলেন। তখন উপস্থিত এক প্রবীণ ব্যক্তি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এমপি উচ্চস্বরে সবাইকে থামতে বলেন এবং জানান, বিচার পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ঘটনাটি নতুন নয়। প্রায় এক মাসেরও বেশি আগে শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া এলাকায় একটি পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ওই সালিস বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের সদস্যসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সালিসে অংশ নেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, বিরোধের দুই পক্ষই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছিল। তবে একপর্যায়ে কে কখন কথা বলবে এবং কার বক্তব্য আগে শোনা হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। সেই অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে সংসদ সদস্য হানজালা মেজাজ হারিয়ে ফেলেন বলে উপস্থিত ব্যক্তিদের অনেকের দাবি। ওই সালিসে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিএনপির সাবেক নেতা তারামিয়া। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিচার চলাকালে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য শোনার সুযোগ থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি মনে করেছেন, আলোচনার একটি পর্যায়ে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। এ নিয়ে আপত্তি জানাতেই কথাকাটাকাটির সূত্রপাত ঘটে।
তারামিয়া বলেন, জনসম্মুখে অনুষ্ঠিত সালিসে নানা ধরনের মত ও যুক্তি আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। বিচারকের দায়িত্ব হলো সব পক্ষের কথা ধৈর্যের সঙ্গে শোনা। কোনো পক্ষ যদি মনে করে তার বক্তব্য গুরুত্ব পাচ্ছে না, তাহলে বিরোধ আরও জটিল হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তাদের মতে, সালিসের পরিবেশ ক্রমেই বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছিল। একাধিক ব্যক্তি একই সময়ে কথা বলতে শুরু করায় বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে এমপি কঠোর ভাষা ব্যবহার করে থাকতে পারেন।
ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সালিসে অনেক মানুষ ছিল। সবাই কথা বলতে চাইছিল। এমপি সাহেব কয়েকবার থামতে বলার পরও কেউ কেউ তর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল। পরে তিনি রেগে যান।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকের একটি অংশ মোবাইল ফোনে ধারণ করা হচ্ছিল। পরে কোনো এক পর্যায়ে ভিডিও ধারণ বন্ধ করতে বলা হলে ধারণকৃত অংশ সেখানেই শেষ হয়। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত ভিডিওই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ মনে করছেন, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে আরও সংযত আচরণ প্রত্যাশিত। আবার অন্যরা বলছেন, ভিডিওর পুরো প্রেক্ষাপট না জেনে শুধু একটি অংশ দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদুল হাসান নামে একজন লেখেন, “জনপ্রতিনিধি মানে শুধু ক্ষমতার প্রতীক নয়, ধৈর্য ও সহনশীলতারও প্রতীক। মানুষ যখন বিচার চাইতে আসে, তখন তাদের কথা শোনার পরিবেশ থাকতে হবে।”
আরেক ব্যবহারকারী নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “এক মিনিটের ভিডিও দেখে পুরো ঘটনা বোঝা যায় না। মাঠের পরিস্থিতি কী ছিল, সেটা না জেনে কাউকে দোষ দেওয়া উচিত নয়।”
তানভীর রহমান নামে একজন লিখেছেন, “রাজনীতিবিদেরা প্রায়ই জনসম্মুখে ভাষা ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তাই তাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত।”
অন্যদিকে, আবদুল্লাহ আল নোমান নামে একজন মন্তব্য করেন, “গ্রামের সালিসে অনেক সময় মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কড়া ভাষা ব্যবহার নতুন কিছু নয়। পুরো ভিডিও প্রকাশ হলে হয়তো বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতো।”
রুমানা ইসলাম নামে আরেকজন লিখেছেন, “কথার চেয়ে আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন জনপ্রতিনিধির প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি মানুষ লক্ষ্য করে। তাই এসব ঘটনা সহজেই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।”
সমালোচনার পাশাপাশি সমর্থনের সুরও ছিল। শিবচরের কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সালিসটি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতাও হয়েছিল।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালা সুখবর ডটকমকে বলেন, ঘটনাটি সাম্প্রতিক নয়; বেশ কিছুদিন আগের। তার দাবি, স্থানীয় লোকজনের অনুরোধেই তিনি সালিসে অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক বাড়তে থাকায় তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর অবস্থান নেন।
তিনি বলেন, সেখানে উপস্থিত লোকজন একে অপরের কথার মধ্যে কথা বলছিলেন। এতে বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। সেই কারণেই তিনি ধমক দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সালিসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমাধানে সন্তুষ্ট ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে জনসম্মুখে উচ্চারিত একটি বাক্য বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওও দ্রুত জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জনপ্রতিনিধিদের আচরণ ও ভাষা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নজরদারির মধ্যে থাকে।
তাদের মতে, গ্রামীণ সালিসে উত্তেজনা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই উত্তেজনা সামাল দেওয়ার ধরনই পরবর্তীতে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। শিবচরের এই ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। সালিসে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও ভিডিওতে ধরা পড়া কয়েকটি মুহূর্ত এখন স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভিডিওটির সত্যতা, প্রেক্ষাপট এবং তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক চললেও একটি বিষয় স্পষ্ট—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে জনসম্মুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ও আচরণ আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। আর সে কারণেই শিবচরের একটি স্থানীয় সালিস বৈঠক কয়েক সপ্তাহ পর এসে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন