ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
দুর্জয় রায়
জুলাই আন্দোলনকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে সর্বপ্রথম আখ্যায়িত করেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। তার এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই জামায়াতি-রাজাকারেরা নিজেদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলে দাবি করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক এক মাস পর, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “...স্বাধীনতা একবারই হয়। এরপর যেগুলো হতে থাকে, সেগুলোকে ‘স্বাধীনতা’ না বলে ‘মুক্তি’ বলাই ভালো। স্বাধীনতাযুদ্ধ বারবার হয় না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চিরকালীন। চিরকালই আমরা অবরুদ্ধ হব এবং চিরকালই জাগ্রত হব।”
ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি আরও বলেন: “কিছুদিন ধরে এই যে আমাদের হঠাৎ মনে হচ্ছে, আমরা মুক্ত! প্রথমে আমরা অনেকে তো এটা বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়েছি। এই মুক্তিকেই এখন আমাদের মূল পরিচয় হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি।”
এই কথাগুলো তিনি বলেন সেই সময়টিতে, যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াত-রাজাকার-ইউনূস চক্র প্রচণ্ড আক্রোশে বঙ্গবন্ধুর সব ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দিয়েছে; পুড়িয়ে ও গুঁড়িয়ে দেওয়া ৩২ নম্বর বাড়িতে বারবার সরকারি বুলডোজার চালিয়ে তা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে; দেশজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হচ্ছে; মুক্তিযুদ্ধের সকল ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে; সারাদেশে অকল্পনীয় মব-সন্ত্রাস ও অগ্নিসন্ত্রাস চলছে; নির্বিচারে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে; খুনি, ডাকাত ও ছিনতাইকারীর ভয়ে দেশবাসী চরম আতঙ্কগ্রস্ত; সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিচার হামলা হচ্ছে; নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে; দেশে চলছে চরম অরাজকতা।
এই পরিস্থিতিতে অধ্যাপক সাহেব নিজেকে ‘মুক্ত’ বলে অনুভব করছেন! এবং এই মুক্তির জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে এতটাই অধীর চিত্তে অপেক্ষা করেছিলেন যে তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না—সত্যিই এই ‘মুক্তি’ তারা অর্জন করতে পেরেছেন! তাই বলছেন: “প্রথমে আমরা অনেকে তো এটা বিশ্বাসই করতে পারিনি।”
তার এই কথাগুলোই বারবার ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের মুখে মুখে, যারা ৫৪ বছর ধরে অপেক্ষা করেছিল একটি ৫ আগস্টের—তাদের ‘মুক্তি ও স্বাধীনতা’ অর্জনের জন্য।
“এই মুক্তিকেই এখন আমাদের মূল পরিচয় হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি”—তার এই একটি বাক্যের মধ্য দিয়েই তার মানসিকতা, তার চিন্তা ও তার ক্রিয়াকর্ম—সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।
ইউনূস-জামায়াত চক্রের মেটিকিউলাস ডিজাইন বা সুপরিকল্পিত গভীর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সুশীল চক্রের নষ্ট ভূমিকাটিও ইতিহাসে লেখা থাকবে; এবং সুশীলরা একটি ঘৃণিত শ্রেণি হিসেবেই গণ্য হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অধ্যাপক সাহেবের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। কিংবা অধ্যাপক সাহেবের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সাহিত্যের পাঠ নেওয়ার জন্যও নয়। হয়তো ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জন্য—হয়তো আরও গভীর কিছু (“আমরা অনেকে এটা বিশ্বাসই করতে পারিনি, আমরা মুক্ত”—এই শিরোনামে প্রথম আলোতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে)।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন