ফাইল ছবি
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু দেশটির সামরিক বাহিনী নয়, রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, নির্বিচারে আটক ও বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ উঠছে। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। আজ মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, সামরিক সহিংসতা এবং সংঘাতনির্ভর অবৈধ অর্থনীতি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রোহিঙ্গাদের সংকটকে শুধু সামরিক জান্তার কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মিও এখন রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের বড় পক্ষ হয়ে উঠেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ, জোর করে শ্রমে বাধ্য করা, নির্বিচারে আটক ও বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, তা বুঝতে হলে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের জাতিগত রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ—দুটিই দেখতে হবে।
রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন নতুন নয়। মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করা হয়েছে। চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার ক্ষেত্রেও তাদের ওপর নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যে থাকা রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করছেন, যাকে সংস্থাটি ‘অ্যাপারথাইড’ বা বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এরপর আসে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। ওই সময় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী উত্তর রাখাইনে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও গ্রাম ধ্বংসের অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে, সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। আজ ওই ঘটনার নয় বছর পূর্ণ হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ২০১৭ সালের অভিযানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হন এবং কয়েক শ গ্রাম ধ্বংস করা হয়।
কিন্তু ২০১৭ সালের পরও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারজুড়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়। অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেয়। এরপর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে গণতন্ত্রপন্থী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। রাখাইন রাজ্যও এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ তীব্র হয়। আরাকান আর্মি দ্রুত রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয়। এতে রোহিঙ্গারা দুই পক্ষের সংঘাতের মাঝখানে পড়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চলতি বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে বুথিডং এলাকায় আরাকান আর্মি অগ্রসর হওয়ার সময় রোহিঙ্গাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, সম্পদ লুট এবং মানুষকে আটক করার মতো ঘটনা ঘটে।
এর একটি ভয়াবহ উদাহরণ হইয়ার সিরি গ্রামের ঘটনা। ২০২৪ সালের ২ মে সেখানে আরাকান আর্মির সদস্যদের হাতে শত শত রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ১৭০ জনের বেশি নিহত বা নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ জন শিশু। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়। পরে গ্রামটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পরও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা ফেরেনি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ওই গ্রামের বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষকে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত একটি অস্থায়ী শিবিরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। সেখানে চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত। খাবার ও চিকিৎসার সংকট রয়েছে। জোর করে শ্রমে নিয়োজিত করার অভিযোগও রয়েছে। ফলে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীর হাত থেকে আরাকান আর্মির হাতে গেলেই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্যও একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে আটক, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম এবং জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রায় ২ হাজার একর জমি দখলের কথা বলা হয়েছে। কিছু প্রত্যক্ষদর্শী ছয় বছর বয়সী শিশুদেরও শ্রমে ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। সাবেক বন্দীরা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কৌশলও বদলায়নি। বরং তা আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, ভয় ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিমান হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়ার পাশাপাশি নজরদারির নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামরিক নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হয়েছে।
রয়টার্সের হিসাবে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সহিংসতায় অন্তত ৮ হাজার ৭৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৪ জন নারী ও ১ হাজার ৭৪ জন শিশু। জাতিসংঘ বলেছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। একই সময়ে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ লাখে। ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। প্রায় চার লাখ মা ও শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।
এই বৃহত্তর সংকটের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সংকটও জড়িয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধ শুধু মানুষকে হত্যা করছে না। মানুষের ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকার পথও ধ্বংস করছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই কৃষিকাজ ও স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। জমি দখল, চলাচলে বাধা এবং খাদ্য সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ তাদের বেঁচে থাকাকেই কঠিন করে তুলছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়—অবৈধ অর্থনীতি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে অবৈধ খনন, মাদক, মানবপাচার ও অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রের মতো কর্মকাণ্ড সংঘাতকে অর্থ জোগাচ্ছে। বিরল ধাতু উত্তোলনও দ্রুত বেড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, কাচিন রাজ্যে ২০২১ সালের পর স্যাটেলাইটে ৩০২টি নতুন খননস্থল শনাক্ত হয়েছে। শান রাজ্যেও খননস্থলের সংখ্যা অভ্যুত্থানের আগের ১২টি থেকে বেড়ে ৮৫টিতে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ মিয়ানমারের যুদ্ধ এখন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও যুক্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে পাওয়া অর্থ সংঘাতকে টিকিয়ে রাখতে পারে। সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, অবৈধ অর্থনীতিও তত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পায়। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাও সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি নিয়ে একই উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে। আজ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপত্তা তারা এখনো দেখছেন না।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও আজ জানিয়েছে, কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত চলতে থাকায় তারা দেশে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। এখানেই রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। প্রত্যাবাসন কি এখন সম্ভব?
বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তরটি সহজ নয়। রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য শুধু সীমান্ত খুলে দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, জমি ও বাড়িঘরের অধিকার এবং জীবিকার নিশ্চয়তা দরকার। কিন্তু এসবের কোনোটিই এখন নিশ্চিত নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্পষ্টভাবে বলেছে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো জবাবদিহির অভাব। ২০১৭ সালের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য এখনো মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার হয়নি। একইভাবে ২০২৪ সালের হইয়ার সিরির মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোরও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তদন্ত হয়নি। বিচার না হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থাকে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক তাই শুধু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে দায়ী করে থামেননি। তিনি রাষ্ট্র, কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের নিজেদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে বলেছেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, মিয়ানমারের সংঘাত থেকে কেউ অর্থনৈতিক সুবিধা নিলে সেই অর্থ যেন মানুষের ওপর নির্যাতন আরও বাড়িয়ে না দেয়।
সব মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, ২০২১ সালের পর মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ। দ্বিতীয়ত, রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির ক্ষমতার লড়াই। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বহু বছরের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য। চতুর্থত, জমি ও সম্পদ দখলের প্রবণতা। পঞ্চমত, সংঘাতকে অর্থ জোগানো অবৈধ অর্থনীতি। আর সবচেয়ে বড় কারণ হলো—অপরাধের বিচার না হওয়া।
২০১৭ সালে যে সংকটের কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল, নয় বছর পরও তার মূল কারণ দূর হয়নি। বরং নতুন সংঘাতের কারণে সংকট আরও জটিল হয়েছে। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা যতই এগোক, বাস্তবতা হলো—মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে সেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। বাংলাদেশের জন্যও এর অর্থ পরিষ্কার। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সমাধান ছাড়া কক্সবাজারের শিবিরগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি মুক্তির পথ খোলা কঠিন।
খবরটি শেয়ার করুন