ছবি: সংগৃহীত
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে হুমায়ুন কবিরের শপথ নেওয়ার পর তার ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও সমালোচনা চলছে। আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন—সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না এবং করে থাকলে তার প্রমাণ কোথায়।
বিষয়টি প্রথম জোরালোভাবে সামনে আসে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্লিৎস পত্রিকার সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর ফেসবুক পোস্টের পর। গতকাল তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমায়ুন কবিরকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন এবং এর পক্ষে প্রমাণপত্রও প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য, প্রশ্ন ও সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা অবস্থায় একজন ব্যক্তি কীভাবে দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে পারেন। অন্যদিকে অনেকে বলছেন, নাগরিকত্ব ত্যাগ করা হয়ে থাকলে সেটির আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ করলেই বিতর্কের অবসান হতে পারে। ফলে বিতর্কটি এখন শুধু রাজনৈতিক সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে সাংবিধানিক যোগ্যতা ও সরকারি নিয়োগের স্বচ্ছতার প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর হুমায়ুন কবির ২৩ ফেব্রুয়ারি তার সাধারণ পাসপোর্ট জমা দেন। ওই মাসেই তিনি সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেন। এরপর সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে সফর করেন। গত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাস ও ফিলিপাইনসহ অন্তত ১১ বার বিদেশ সফরের তথ্যও সামনে এসেছে।
তবে সাধারণ পাসপোর্ট জমা দিয়ে সরকারি পাসপোর্ট নেওয়া আর বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করা—দুটি এক বিষয় নয়। নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এ কারণেই হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতাও হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকার কথা জানিয়েছেন ঢাকার গণমাধ্যমকে। তবে তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে সেই নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর কাছেও নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেশের সংবিধান। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া যায়। তবে তাদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হয়। আর সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২(গ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারান।
এই সাংবিধানিক বিধানের কারণেই হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নটি নিছক ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয় নয়। তিনি বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সেটি তার সরকারি পদে থাকার সাংবিধানিক যোগ্যতার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত হুমায়ুন কবিরের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হয়। শুধু নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করলেই তা কার্যকর হয়ে যায় না; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে হয়।
দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতেও বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের আগে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করে কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনসংক্রান্ত প্রমাণ দেখাতে পারা প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ করার নজিরও রয়েছে। একইভাবে আগের নির্বাচনগুলোতেও বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে প্রার্থিতা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে।
হুমায়ুন কবিরের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেও বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। সিলেটের ওসমানীনগরে জন্ম নেওয়া হুমায়ুন কবির শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে তার বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং লিডস ল স্কুল থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও তিনি কাজ করেছেন।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও তার যুক্তরাজ্য-সংযোগ দীর্ঘদিনের। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদ চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হুমায়ুন কবির লেবার পার্টির বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো শাখার সেক্রেটারি ছিলেন। পরে বাংলাদেশি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হন।
এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদে আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করার তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে।
ফলে হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের পরিধি বেশ বিস্তৃত। তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ছিল কি না, সেটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগরিকত্ব ত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নও। পাশাপাশি একজন গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিনির্ধারকের দীর্ঘ ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে।
খবরটি শেয়ার করুন