ছবি: সংগৃহীত
সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আলাউইত জনগোষ্ঠীর বিক্ষোভ চলাকালে রোববার (২৮শে ডিসেম্বর) অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। গত শুক্রবার হোমস প্রদেশে আলাউইত জনগোষ্ঠীর একটি মসজিদে বোমা হামলার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ হয়। ওই বোমা হামলায় আটজন নিহত হয়েছিলেন। খবর এএফপির।
বিক্ষোভে অংশ নিতে রোববার সিরিয়ার পশ্চিম উপকূল ও মধ্য সিরিয়ার কয়েকটি প্রদেশে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। মসজিদে বোমা হামলার প্রতিবাদে শনিবার আলাউইতদের আধ্যাত্মিক নেতা গাজাল গাজাল এ বিক্ষোভের ডান দেন। গত বছরের ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এই জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন।
যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে আলাউইত–অধ্যুষিত লাতাকিয়া প্রদেশে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়। এতে দুজন নিহত হন।
পরে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা লাতাকিয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, শহরে বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক মানুষের ওপর ‘সাবেক সরকারের অবশিষ্ট অংশের হামলায়’ ৩ জন নিহত এবং ৬০ জন আহত হয়েছেন।
লাতাকিয়া ও উপকূলীয় শহর জাবলেহ থেকে এএফপির সংবাদদাতারা জানান, বিক্ষোভকারী ও সিরিয়ার নতুন ইসলামপন্থী সরকারের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা হস্তক্ষেপ করেন এবং আকাশে ফাঁকা গুলি ছোড়েন।
সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে লাতাকিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল আজিজ আল-আহমাদ বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের ওপর অজ্ঞাতনামা স্থান থেকে সরাসরি গুলি করা হয়েছে।’ এতে বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছেন।
এএফপির এক সংবাদদাতা জানান, পরে সরকারপন্থী সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতেও সরকারি বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
সিরিয়ান অবজারভেটরির তথ্যমতে, লাতাকিয়ার পাশাপাশি হোমস প্রদেশেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
‘সারায় আনসার আল-সুন্না’ নামের সুন্নি চরমপন্থীদের একটি গোষ্ঠী শুক্রবার আলাউইত জনগোষ্ঠীর মসজিদে হামলার দায় স্বীকার করে। বাশারের পতনের পর থেকে আলাউইত ও দেশটির অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বেড়েছে।
গত মার্চে সিরিয়ার আলাউইত–অধ্যুষিত উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। দেশটির জাতীয় কমিশনের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চের এ হত্যাযজ্ঞে আলাউইত জনগোষ্ঠীর অন্তত ১ হাজার ৪২৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে সিরিয়ান অবজারভেটরির দাবি, এ হত্যাযজ্ঞে ১ হাজার ৭০০ জনে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সরকারের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার জেরে এ সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল।
গত জুলাইয়ে দ্রুজ সংখ্যালঘু–অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলের সুয়েইদা প্রদেশে ভয়াবহ সংঘাত হয়। সিরিয়ান অবজারভেটরির তথ্যমতে, এতে দুই হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। আলাউইতদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে গত মাসের শেষের দিকে হোমস এবং অন্যান্য প্রদেশে বিক্ষোভ হয়েছিল।
গত মার্চে আলাউইতদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর আগে এ জনগোষ্ঠীর মানুষদের ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা বাশারের সমর্থক।
গত শুক্রবার মসজিদে বোমা হামলার পর শনিবার গাজাল গাজাল বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়ে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, বিশ্বকে দেখাতে হবে—আলাউইত জনগোষ্ঠীকে অবমাননা বা কোণঠাসা করে রাখা যাবে না।
ইসলামিক আলাউইত কাউন্সিলের প্রধান গাজাল গাজাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া ওই ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা গৃহযুদ্ধ চাই না, আমরা কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য (রাজনৈতিক ফেডেরালিজম) চাই। আমরা আপনাদের সন্ত্রাস চাই না। আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চাই।’
লাতাকিয়ায় বিক্ষোভকারীরা গাজালের ছবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। ব্যানারে নানা স্লোগান লিখে তার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। তারা কর্তৃপক্ষের প্রতি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমিয়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
অনেক প্ল্যাকার্ডে ‘সাম্প্রদায়িক বক্তব্য বন্ধ’ এবং নাগরিক ও সাবেক সেনাদের বেতন পরিশোধের দাবি-দাওয়া লেখা ছিল।
ইসলামিক আলাউইত কাউন্সিল রোববার এক বিবৃতিতে অভিযোগ করে, কর্তৃপক্ষ ‘নিরস্ত্র নাগরিকদের’ ওপর হামলা চালাচ্ছে। অথচ তারা তাদের ‘বৈধ অধিকারের’ দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। বিবৃতিতে সমর্থকদের বাড়ি ফিরে যেতে অনুরোধ জানানো হয়।
সিরিয়ার জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই সুন্নি মুসলিম। হোমসে সুন্নিরা সংখ্যাগুরু হলেও বেশ কিছু এলাকা আলাউইত–অধ্যুষিত। আলাউইতদের ধর্মবিশ্বাস শিয়া ইসলাম থেকে উদ্ভূত।
রোববারের বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিও উঠেছে। শুক্রবার সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, লাতাকিয়ায় ৭০ জন বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কারণ, ‘তারা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে’। নির্দোষ প্রমাণিত হলে আরও বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে।
বাশার আল আসাদের পতনের পর আহমেদ আল-শারা সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। তার সরকার আশ্বস্ত করেছে, সিরিয়ার সব সম্প্রদায়কে সুরক্ষা দেওয়া হবে। কিন্তু ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নতুন ইসলামপন্থী সরকারের এ আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছে না। তারা ফেডেরালিজম তথা কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তা এখন পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন