ছবি: সংগৃহীত
কানাডা বহু বছর ধরে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সফল দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষ করে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে ‘ট্রিটমেন্ট অ্যাজ প্রিভেনশন’ কৌশলের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। একসময় মনে করা হচ্ছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস মহামারি নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘের লক্ষ্য অর্জনের পথে কানাডা অন্যতম অগ্রসর দেশ হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই আশাবাদে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
নতুন সরকারি তথ্য বলছে, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে কানাডায় নতুন এইচআইভি সংক্রমণ প্রায় ২৩ শতাংশ বেড়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন সতর্ক করছেন, দীর্ঘদিনের অর্জিত সাফল্য হুমকির মুখে পড়েছে।
কানাডার পাবলিক হেলথ এজেন্সির সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৪ সালে দেশে আনুমানিক ২ হাজার ৫১৭ জন নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫০ জন। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাতজন নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।
যদিও ২০২৪ সালে নিবন্ধিত নতুন রোগনির্ণয়ের সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় কিছুটা কমেছে, তবে প্রকৃত নতুন সংক্রমণের আনুমানিক হিসাব এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়েই রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিসি নিউজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—এইচআইভি আর শুধু টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার বা মন্ট্রিয়ালের মতো বড় শহরের সমস্যা নয়। এটি এখন ছোট শহর, প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এসব এলাকায় পরীক্ষার সুযোগ, প্রতিরোধমূলক ওষুধ, চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ সেবার ঘাটতি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিসি সেন্টার ফর এক্সেলেন্স ইন এইচআইভি/এইডস-এর নির্বাহী পরিচালক চিকিৎসক জুলিও মন্টানার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, প্রতি সপ্তাহেই ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় নতুন সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বহু বছরের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত অগ্রগতি এখন যেন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মন্টানারই ২০০৬ সালে ‘ট্রিটমেন্ট অ্যাজ প্রিভেনশন’ কৌশল চালু করেছিলেন, যা পরে জাতিসংঘ বৈশ্বিক এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত এইচআইভি পরীক্ষা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়েছিল। মহামারি শেষে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ায় অনেক পুরোনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তবে এটিই পুরো ব্যাখ্যা নয়। কারণ সরকারি মডেলিং দেখাচ্ছে, প্রকৃত নতুন সংক্রমণও বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষতিকর মাদক ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ম্যানিটোবা ও সাসকাচেওয়ানে ইনজেকশন ড্রাগ ব্যবহারের সঙ্গে এইচআইভি সংক্রমণের সম্পর্ক ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ সিরিঞ্জ কর্মসূচি, আসক্তি নিরাময় এবং ক্ষতি-হ্রাস কার্যক্রম পর্যাপ্ত না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
তৃতীয়ত, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, গৃহহীন মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং দূরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য কানাডিয়ান প্রেস ও সিবিসি-এর প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অনেক মানুষ এখনো সময়মতো পরীক্ষা করান না বা নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন না। ফলে অজান্তেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
২০১৯ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ঘোষণা দিয়েছিল, তারা কার্যত এইডস মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। সে সময় নতুন এইডস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গিয়েছিল এবং নতুন সংক্রমণও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে সেই ইতিবাচক ধারা আর বজায় থাকেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য পরিস্থিতিকে আবারও খারাপের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে ম্যানিটোবা প্রদেশে এইচআইভিকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। সেখানে সংক্রমণের হার জাতীয় গড়ের প্রায় সাড়ে তিন গুণ। একইভাবে সাসকাচেওয়ানও দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রদেশগুলোর একটি। এসব অঞ্চলে নতুন সংক্রমণের বড় অংশের সঙ্গে মাদক ইনজেকশনের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চিকিৎসা নয়, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আসক্তি নিরাময় কর্মসূচিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতিসংঘের এইডসবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডস ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘৯৫-৯৫-৯৫’ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ, এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯৫ শতাংশকে শনাক্ত করতে হবে, শনাক্তদের ৯৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে এবং চিকিৎসাধীনদের ৯৫ শতাংশের ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
কানাডার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে আনুমানিক ৭০ হাজার ৯০০ জন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে ৯১ শতাংশ নিজের সংক্রমণের বিষয়ে জানেন, শনাক্তদের ৮৬ শতাংশ চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং চিকিৎসাধীনদের ৯৬ শতাংশের ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ শেষ সূচকে সফল হলেও প্রথম দুটি লক্ষ্যমাত্রা এখনো অর্জিত হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউএনএইডস বরাবরই বলে আসছে, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ নয়, দ্রুত পরীক্ষা, প্রতিরোধমূলক ওষুধ, নিরাপদ যৌন আচরণ, সূঁচ বিনিময় কর্মসূচি এবং সামাজিক বৈষম্য কমানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার বিশেষজ্ঞরাও একই পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
জনস্বাস্থ্য গবেষকদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, এইচআইভি নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেক মানুষ সামাজিক লজ্জা বা বৈষম্যের ভয়ে পরীক্ষা করাতে চান না। ফলে সংক্রমণ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। এতে চিকিৎসা শুরু বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। সরকারি মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বৈষম্য ও স্বাস্থ্যসেবায় অসম প্রবেশাধিকার এখনো এইচআইভি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় বাধা।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। দীর্ঘদিন সংক্রমণ কমে এলেও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে শৈথিল্য এলে বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে এইচআইভি আবারও বাড়তে পারে।
তাই শুধু উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকাই যথেষ্ট নয়; সেই ব্যবস্থাকে সবার জন্য সহজলভ্য, বৈষম্যহীন এবং ধারাবাহিক রাখতে হবে। অন্যথায় একসময় এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের জন্য যে দেশটি উদাহরণ ছিল, সেই কানাডাকেই আবার নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধির কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন