ছবি: সংগৃহীত
প্রায় দুই দশক পর কলকাতার মঞ্চে ফিরেছিলেন নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই প্রত্যাবর্তন হওয়ার কথা ছিল সাহিত্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের এক আবেগঘন মুহূর্ত। কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে অন্য একটি ঘটনা। কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডাকার পর দর্শকদের একাংশের তীব্র প্রতিবাদ, স্লোগান এবং হট্টগোল পুরো আয়োজনের আবহ বদলে দেয়। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নতুন বিতর্ক।
কেউ বিজেপি সমর্থকদের আচরণের সমালোচনা করেন, আবার কেউ তসলিমা নাসরিনকেই দায়ী করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঘটনার জন্য তসলিমা নাসরিনকে দায়ী করার কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি? ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং তসলিমা নাসরিনের নিজের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘটনাটি বরং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণের প্রতিফলন। তসলিমা এখানে বিতর্কের কারণ নন; বরং তিনিও এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার একজন বিব্রত প্রত্যক্ষদর্শী।
গতকাল শনিবার কলকাতার রবীন্দ্র সদনে তসলিমা নাসরিনকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যের কয়েক মন্ত্রী, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা, আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময় ডিজিটাল এবং টিভি৯ বাংলা—সবগুলো গণমাধ্যমই জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি মূলত তসলিমা নাসরিনের দীর্ঘ নির্বাসনের পর কলকাতায় প্রত্যাবর্তনকে ঘিরেই আয়োজন করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে তসলিমা নাসরিন বক্তব্য দিতে গিয়ে দর্শকাসনে বসে থাকা কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে আসার অনুরোধ জানান। তার উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। জয় গোস্বামী বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। ব্যক্তিগত মতপার্থক্য থাকলেও তিনি অতীতে তসলিমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, বই উৎসর্গ করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে তার প্রতি সহমর্মিতাও প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু জয় গোস্বামী মঞ্চের দিকে এগোতেই দর্শকদের একাংশ 'চটিচাটা' বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। উপস্থিত অনেকেই ছিলেন বিজেপির সমর্থক ও কর্মী। পরিস্থিতি দ্রুত অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। প্রবীণ কবি পরিস্থিতি বুঝে আর মঞ্চে ওঠেননি। তিনি আবার নিজের আসনে ফিরে যান।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ দাবি করেন, তসলিমা নাসরিন ইচ্ছাকৃতভাবে জয় গোস্বামীকে বিব্রত করেছেন। কেউ বলেন, তিনি আগে থেকেই জানতেন কী ঘটতে পারে। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসেনি।
বরং এই সময় ডিজিটাল–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তসলিমা নাসরিন স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি এমন পরিস্থিতি একেবারেই আশা করেননি। তিনি বলেন, "আমি এটা আশা করিনি। আমি তো বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তার রাজনৈতিক ভাবনা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তিনি তো বাংলা ভাষার বড় কবি।"
তসলিমা আরও বলেন, জয় গোস্বামী তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, বই উৎসর্গ করেছেন এবং ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও তাকে সমর্থন করেছেন। তাই তাকে মঞ্চে ডাকাটা ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সৌজন্যমূলক।
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল না। বরং দর্শকদের প্রতিক্রিয়া তাকেও বিস্মিত করেছে।
আসলে এই বিতর্কের শিকড় অনেক পুরোনো। ২০০৭ সালে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। সে সময় পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারও তাকে স্থায়ীভাবে কলকাতায় ফেরার সুযোগ দেয়নি বলে তসলিমা একাধিকবার অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে জয় গোস্বামী দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতির মূলধারার অন্যতম মুখ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে তাকে শাসকঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী হিসেবে দেখেছেন অনেকেই। সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাংশের মধ্যে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল বলে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আনন্দবাজার পত্রিকাও উল্লেখ করেছে, জয় গোস্বামীকে ঘিরে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষোভ বড় কারণ ছিল।
অর্থাৎ প্রতিবাদটি ছিল জয় গোস্বামীর প্রতি রাজনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। তসলিমা নাসরিন ছিলেন সেই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তি, কিন্তু কারণ ছিলেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ অবশ্য যুক্তি দিচ্ছে, তসলিমা নাসরিন মঞ্চে জয় গোস্বামীকে না ডাকলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এই যুক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
একজন লেখক যদি আরেকজন কবিকে সম্মান জানিয়ে মঞ্চে আহ্বান করেন, সেটি কোনোভাবেই অস্বাভাবিক নয়। একজন অতিথি হিসেবে তসলিমা সেটাই করেছিলেন। এরপর দর্শকদের আচরণ কী হবে, তা তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। বরং ঘটনাটির পর তার প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে, তিনি পরিস্থিতিতে বিব্রত হয়েছেন।
ভারতের সাহিত্য মহলের অনেকেই অতীতে বলেছেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সাহিত্যিকদের মধ্যে সংলাপ বন্ধ হওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন সময়ে দ্য টেলিগ্রাফ, আনন্দবাজার পত্রিকা এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত মতামতে লেখক ও কবিরা বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এই ঘটনার মধ্যেও সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
একজন কবির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করার সংস্কৃতি কি গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? তসলিমা নাসরিন নিজেই তো দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে লড়াই করে আসছেন। বাংলাদেশে মৌলবাদীদের হুমকি, কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়া, দিল্লিতে নিরাপত্তাবেষ্টিত জীবন—সবকিছুই তার জীবনের অংশ।
তাই তিনি যদি জয় গোস্বামীর মতো ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের একজন কবিকেও মঞ্চে ডাকেন, সেটি তার দীর্ঘদিনের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক সমালোচনা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কারণ সমালোচনার মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠেন তসলিমা, অথচ ঘটনার নিয়ন্ত্রণ ছিল দর্শকদের হাতে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজন শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, চলচ্চিত্র—সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়ছে। কোনো শিল্পীকে এখন অনেক সময় তার সাহিত্য বা শিল্পের জন্য নয়, রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিচার করা হচ্ছে। জয় গোস্বামীকে ঘিরে রবীন্দ্র সদনের ঘটনাও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হওয়ার কথা ছিল তসলিমা নাসরিনের দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতার মঞ্চে ফিরে বলা সেই বাক্য—"অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী হতে পারে না।" কিন্তু কয়েক মিনিটের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সেই বার্তাকে আড়াল করে দেয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য।
তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাহিত্যিক সংহতির আলোচনা ছাপিয়ে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে হট্টগোল ও রাজনৈতিক বিভাজন। ঘটনার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করলে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডাকা ছিল তসলিমা নাসরিনের ব্যক্তিগত সৌজন্য। তাকে অপমান করা বা হট্টগোল সৃষ্টি করা তার সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং সেই পরিস্থিতিতে তিনিও বিব্রত হয়েছেন এবং পরে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ফলে এই ঘটনার দায় তসলিমা নাসরিনের ওপর চাপানোর চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণ, সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমত গ্রহণের সংকট নিয়েই বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ রবীন্দ্রনাথের শহরে একজন কবিকে মঞ্চে উঠতে না দেওয়ার ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি দলের আচরণের প্রশ্ন নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশেরও একটি প্রতিচ্ছবি।
খবরটি শেয়ার করুন