প্রতীকী ছবি
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় সংস্কার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাগেরহাটের মোংলার এক জেলেকে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে সেই প্রত্যাশার ওপর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এটি জোরপূর্বক গুমের প্রথম পরিচিত ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। সংস্থাটি ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো নিখোঁজের ঘটনা হিসেবে দেখছে না; বরং অতীতে দেশে জোরপূর্বক গুমের যে ধারাবাহিক অভিযোগ ছিল, তার সঙ্গে উদ্বেগজনক সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছে।
মোংলা থেকে কোস্টগার্ডের পরিচয়ে জেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এটি জোরপূর্বক গুমের প্রথম পরিচিত ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা অবিলম্বে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করা, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং গুম প্রতিরোধে নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।
গতকাল রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানায়, মোংলা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মণি গ্রামের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখ পেশায় একজন জেলে। গত ১০ এপ্রিল রাতে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী তাকে কোস্টগার্ড সদস্যদের আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, পরদিন মিরাজের পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাদের জানানো হয়, তাকে নিয়ে একটি অভিযান চলছে এবং বিকেলে আসতে বলা হয়। কিন্তু পরে তারা আবার গেলে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিরাজ কখনোই তাদের হেফাজতে ছিলেন না।
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, যে চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেখানে তার মোটরসাইকেলটি রেখে যাওয়া হয়েছিল। দোকানের মালিক সংস্থাটিকে জানান, ২১ এপ্রিল এক ব্যক্তি কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে এসে মোটরসাইকেলের তালা খুলে নিয়ে যান। তবে পরদিন কোস্টগার্ড সদস্যরা সেটি আবার ফিরিয়ে দেন।
মিরাজের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন এইচআরডব্লিউকে বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা গুমের সময়, স্থান, পরিস্থিতি এবং কীভাবে কোস্টগার্ড সদস্যরা মিরাজকে নিয়ে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, মিরাজের পরিবার থানায় অভিযোগ করেছে, সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদনও করেছে। কিন্তু এতেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরে গত ১২ জুলাই মিরাজের বাবা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে কোস্টগার্ডের পশ্চিম জোনের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বারবার মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে এইচআরডব্লিউর মতে, ঘটনাটি অতীতে জোরপূর্বক গুমের যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তার সঙ্গে উদ্বেগজনক মিল রয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি দেখাচ্ছে, প্রকৃত সংস্কার না হলে এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। স্পষ্ট যে, এসব চর্চা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের উচিত কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’
এইচআরডব্লিউ বলছে, সরকার পরিবর্তনের পর এমন একটি স্বাধীন সংস্থা গঠনের ব্যাপারে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, যার হাতে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদে পাস না করিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার এমন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে, যাতে গুমের তদন্ত পুলিশের হাতেই থাকবে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সীমিত হয়ে যাবে। পাশাপাশি কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রভাব বাড়বে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘সরকারের উচিত প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর সব ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ দূর করা এবং জোরপূর্বক গুম তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। পুলিশকে দিয়ে গুমের তদন্ত করালে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা বন্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধও তৈরি হবে না।’
দেশে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নতুন নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশীয় মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন পশ্চিমা সরকার বারবার এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, বহু ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিলেন; কেউ কেউ পরে ফিরে এলেও অনেকে আর ফেরেননি। একই ধরনের তথ্য বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন।
জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সস বহু বছর ধরে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিভিন্ন নিখোঁজের ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে আসছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরও বলেছে, জোরপূর্বক গুম আন্তর্জাতিক আইনে একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এটি ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, সামাজিক ও আইনি প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একাধিক প্রতিবেদনে বলেছে, জোরপূর্বক গুম শুধু ব্যক্তির স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না; এটি আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং নাগরিকদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি তৈরি করে। সংস্থাটির মতে, প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া জরুরি।
দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ড. শাহদীন মালিক বিভিন্ন সময়ে মূলধারার গণমাধ্যমে বলেছেন, গুমের অভিযোগের তদন্ত সেই সংস্থার হাতে দেওয়া উচিত নয়, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্ত কাঠামো অপরিহার্য।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যায়। তার মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বাধীন তদন্ত, বিচার এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের অভিজ্ঞতা এবং সরকারের অবস্থান—সব পক্ষের বক্তব্যই তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা বারবার বলেছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
মোংলার মিরাজ শেখের ঘটনা এখন শুধু এক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ নয়; এটি মানবাধিকার পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল—অতীতের বিতর্কিত চর্চাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা।
এখন আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন, মিরাজ শেখের অবস্থান উদ্ঘাটন এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তই নির্ধারণ করবে, রাষ্ট্র এই ঘটনাকে কীভাবে মোকাবিলা করছে। একই সঙ্গে গুমবিরোধী আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা এবং তদন্ত কাঠামো নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিও আগামী দিনে মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।
অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই পারে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। আর সেই কারণেই মিরাজ শেখের ঘটনাটি কেবল একটি নিখোঁজ ব্যক্তির অনুসন্ধানের বিষয় নয়; এটি আইনের শাসন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বাস্তব পরীক্ষাও বটে।
খবরটি শেয়ার করুন