ফাইল ছবি
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে চলে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তার এই ঘোষণার পর দেশে-বিদেশে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশে হত্যা মামলা থাকায় তিনি কীভাবে ফিরবেন, দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) নিউইয়র্ক সময় দুপুর ১২টা, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় প্রচারিত ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন টকশো’ টকশোতে এ বিষয়ে কথা বলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম। সাংবাদিক ও উপস্থাপক খালেদ মুহিউদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরও ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে কীভাবে ফিরবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে হাসনাত কাইয়ুম বলেন, শেখ হাসিনার নামে দেশে হত্যা মামলা রয়েছে। বর্তমান সরকারও তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়। ফলে তাকে ফিরিয়ে আনতে হলে একটি আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন। দুই দেশের সরকারের মধ্যে কোনো ধরনের বোঝাপড়া ছাড়া এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা কঠিন।
হাসনাত কাইয়ুমের ভাষ্য, যেকোনোভাবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলেও তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তার মতে, দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না; এর সঙ্গে আইনগত ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার বিষয়টিও জড়িত।
এর আগে ৫ আগস্ট ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, তিনি আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরবেন। তার এ ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন এবং দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর কী হবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অনুষ্ঠানে রুমিন ফারহানার কাছে জানতে চাওয়া হয়, শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণা তিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। এর জবাবে তিনি বলেন, তার ‘কমনসেন্স’ বলছে, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে পারেন।
রুমিন ফারহানার মতে, শেখ হাসিনা যদি দেশের বাইরে থেকে জীবনের বাকি সময় কাটিয়ে দেন, তাহলে আওয়ামী লীগও হয়তো আর দেশের মাটিতে ফিরতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টি শেখ হাসিনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া দলটির জন্য তার পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে মনে করেন রুমিন।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমতও রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দেশে ফিরে তার আইনি জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনার কারণে অনেকে মনে করছেন, ঘোষিত সময়ে তার দেশে ফেরা সহজ হবে না।
টকশোতে শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলন নিয়ে দেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ না করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। রুমিন ফারহানা বলেন, বিএনপি সরকার আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রুমিন ফারহানা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের বক্তব্য ও সংবাদ প্রকাশেও একই ধরনের বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু তাতে তার বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানো বন্ধ করা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ তার বক্তব্য জেনেছে। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন। তাই সংবাদ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যই নেতিবাচক হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হাসনাত কাইয়ুমও শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন। তার মতে, সরকার এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোর কারণে সংবাদ সম্মেলনটির গুরুত্ব বরং বেড়ে গেছে। সরকার যদি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিত, তাহলে হয়তো এত আলোচনা তৈরি হতো না।
হাসনাত কাইয়ুম বলেন, দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যসহ মানুষের দৈনন্দিন নানা সমস্যা রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে এসব বিষয় অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। এতে সরকারের জন্য একটি দিক থেকে সুবিধা হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগও আবার আলোচনায় আসার সুযোগ পেয়েছে।
তার মতে, বিএনপির উচিত শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ না দিয়ে জনগণের নিত্যদিনের সংকট সমাধানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি এবং অন্যান্য জনদুর্ভোগ নিরসনে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে ৬ আগস্টের ওই টকশোতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার কারণে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নেটিজেন সাইফুল ইসলাম লিখেছেন, ‘দেশে ফিরতে চাইলে অবশ্যই আইনের মুখোমুখি হতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কারও জন্য আইনের বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে না।’ নাজমা রহমান লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা ফিরবেন কি না, সেটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশে ফিরলে আইন কীভাবে তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে। বিচারপ্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়।’
তবে আরিফ হোসেন ভিন্নমত দিয়ে লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক বিতর্ক না করে সরকারের উচিত অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য ও মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার দিকে বেশি নজর দেওয়া।’ মাহমুদুল হাসান লিখেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কারও বক্তব্য বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। বরং রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত।’
শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তার ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে। হাসনাত কাইয়ুমের বক্তব্য অনুযায়ী, যে পথেই তিনি দেশে ফিরুন না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আর রুমিন ফারহানার ধারণা, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন থেকেই শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
খবরটি শেয়ার করুন