ছবি: সংগৃহীত
সরকার পরিচালনায় দক্ষতা বাড়ানো, প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনা এবং ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সরকারের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করার লক্ষ্যে নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সপ্তাহে অন্তত দুই দিন দলীয় কার্যালয়ে বসার মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নিজেও সময় সুযোগ মিললে সপ্তাহে অন্তত এক দিন দলীয় কার্যালয়ে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগ শুধু বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত করবে না, বরং সচিবালয়কেন্দ্রিক তদবির সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, বদলি-পদায়নসহ নানা তদবির নিয়ে সচিবালয়ে ভিড় বাড়ছে। এসব তদবিরকারীদের মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীরাও রয়েছেন। ফলে প্রশাসনিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি মন্ত্রীদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শত শত মানুষ বিভিন্ন আবেদন নিয়ে উপস্থিত থাকছেন। কেউ ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান চাইছেন, কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করছেন, আবার কেউ এলাকার প্রভাবশালী নেতার নাম ভাঙিয়ে কাজ আদায়ের চেষ্টা করছেন।
এ প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীদের দলীয় কার্যালয়ে বসার নির্দেশনা মূলত সচিবালয়ের ওপর চাপ কমানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ আরও পেশাদার ও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মন্ত্রীদের নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে বসার মাধ্যমে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হবে। এতে করে এলোমেলোভাবে সচিবালয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ দলীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক করে তুলতে পারে।
দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় ‘তদবির’ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। বদলি, পদায়ন কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে বলেন, “সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির। এসব যদি প্রধান গুরুত্ব পায়, তাহলে তো সমস্যা তৈরি হবে।”
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তদবিরের চাপ শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে না, বরং নীতিনির্ধারণী কাজেও প্রভাব ফেলছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দলীয় কার্যালয়কে যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু বানানো গেলে তদবিরের চাপ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ, এতে করে ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিবর্তে একটি সংগঠিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সীমিত রাখা জরুরি। সচিবালয় মূলত নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের জায়গা—এখানে অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা তদবির প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায়। যা গত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে দেখা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, “যদি মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা যোগাযোগের জন্য আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম থাকে, তাহলে সচিবালয় তার পেশাদার পরিবেশ বজায় রাখতে পারবে। এতে প্রশাসনের ওপর জনআস্থা বাড়বে।”
তার মতে, এ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নিয়মিত উপস্থিতি, নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।
সরকার গঠনের পর বিএনপির নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কমে গিয়েছিল। অনেকেই সরাসরি সচিবালয়ের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৮ মার্চ প্রথমবার কার্যালয়ে গিয়ে তারেক রহমান নতুন করে সেই কেন্দ্রকে সক্রিয় করার বার্তা দেন।
সেদিন কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ব্যাপক সমাগম হয় এবং দীর্ঘদিন পর সেখানে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। দলীয় প্রধান ঘোষণা দেন, সুযোগ পেলেই তিনি কার্যালয়ে বসবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি দলীয় কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে করে তৃণমূলের সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের যোগাযোগ বাড়বে এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে গতি আসবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মন্ত্রীদের ব্যস্ততা, সরকারি কাজের চাপ এবং সময় ব্যবস্থাপনা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া দলীয় কার্যালয়ে অতিরিক্ত ভিড় বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে সেটিও নতুন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রয়োজন। যেমন—নির্ধারিত সময়সূচি, আগাম তালিকা অনুযায়ী সাক্ষাৎ এবং বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। এতে করে কার্যক্রম হবে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ।
সব মিলিয়ে, মন্ত্রীদের বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে বসার নির্দেশনাকে একটি ইতিবাচক প্রশাসনিক সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন তদবির সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে দল-সরকারের সমন্বয়ও জোরদার করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থাৎ, সচিবালয়ের চাপ কমানো থেকে শুরু করে দলীয় কাঠামো শক্তিশালী করা—সব দিক থেকেই এই উদ্যোগ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বাস্তব প্রয়োগে এটি কতটা সফল হয় এবং কত দ্রুত কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়।
খবরটি শেয়ার করুন