রবিবার, ৫ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইরানকে আর কতবার আলটিমেটাম দেবেন ট্রাম্প *** মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলাতে চায় জামায়াত? *** কেরানীগঞ্জে নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা করে দেবে সরকার *** সংবিধানকে ‘কাগজ’ হিসেবে দেখা মানে রাষ্ট্রের আইনি ভিত্তিকে অস্বীকার করা *** গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি জামায়াত জোটের *** জামায়াত বিএনপিকেও একদিন নিষিদ্ধ করবে: তসলিমা নাসরিন *** আওয়ামী লীগকে কী নিষিদ্ধই করতে যাচ্ছে সরকার? *** ‘বিদেশি অনুদানের দুইশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ড. ইউনূস’ *** ড. ইউনূসকে মুখ খুলতে হবে, অর্জন ধরে রাখতে মাঠে নামতে হবে: নাহিদ *** এপ্রিলে আসছে একাধিক তাপপ্রবাহ, যা বলছেন আবহাওয়াবিদরা

মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলাতে চায় জামায়াত?

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ০২:২৯ পূর্বাহ্ন, ৫ই এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি (সংগৃহীত)

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্রের পরিচয়, রাজনৈতিক চেতনা এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। সেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো সংজ্ঞা, বিশেষ করে ‘মুক্তিযোদ্ধা’—এটি নিছক প্রশাসনিক বা আইনি বিষয় নয়; বরং এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আবেগঘন একটি প্রশ্ন।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’কে কেন্দ্র করে নতুন করে সেই বিতর্ক সামনে এসেছে। বিশেষ করে, জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আপত্তি এই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। সংবিধান অনুযায়ী, এসব অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদিত না হলে কার্যকারিতা হারায়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে এগুলো উপস্থাপন করা হয় এবং যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

এই কমিটি ১৩৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে পাস করার সুপারিশ করে। সেই তালিকার ৩৮ নম্বরে রয়েছে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’। কিন্তু অধ্যাদেশটি বিতর্কের কেন্দ্রে, কারণ এতে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট ধারণাগুলোর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন ব্যক্তিদের, যারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন—দেশের ভেতরে বা ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম নিবন্ধন করে।

এছাড়া পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী সংগঠন—রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ, পুলিশ, ইপিআর, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যদেরও এই সংজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

অন্যদিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি ছিল একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে পরিচালিত যুদ্ধ।

এই অধ্যাদেশে আপত্তি জানিয়েছেন সংসদীয় কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য—মো. মুজিবুর রহমান, জি এম নজরুল ইসলাম ও মো. রফিকুল ইসলাম খান। তারা মোট ১৭টি অধ্যাদেশে নোট অব ডিসেন্ট দিলেও, মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন অধ্যাদেশ নিয়ে তাদের আপত্তি বিশেষভাবে আলোচিত।

জামায়াত বলছে, অধ্যাদেশে যেভাবে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামকে পাকিস্তানের সহযোগী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, এতে এসব দল যেন ‘পাকিস্তানি’ পরিচয়ের ধারাবাহিকতায় রয়ে যাচ্ছে—যা তারা অযৌক্তিক বলে মনে করেন।

তারা সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। তাদের যুক্তি, রাজনৈতিক ঐক্য ও সম্প্রীতির স্বার্থে সংজ্ঞাগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কেউ কেউ বলছেন, জামায়াতের আপত্তি শুধু ভাষাগত নয়; বরং সংজ্ঞার ভেতরের রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়েই তাদের মূল আপত্তি।

অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম এই পরিবর্তনের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করেছিলেন—ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় লক্ষাধিক ভুয়া নাম রয়েছেন, যা যাচাই-বাছাই এবং বিতর্ক নিরসনের জন্য সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছিল।

সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি প্রশাসনিক সংস্কার, যার উদ্দেশ্য তালিকাকে নির্ভুল করা এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান নিশ্চিত করা।

যদিও সরকারের যুক্তি প্রশাসনিক, বাস্তবে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছিল। আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছিল—এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি অন্তর্বর্তী সরকারের আছে?

সমালোচকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয়ভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নির্বাচিত সরকারের। কারণ, এ ধরনের সিদ্ধান্তে জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট থাকা জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250