বুধবার, ২১শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বন্ধ হতে পারে দেশে ৬ কোটি বাটন ফোন *** প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বিদায় *** আলজেরিয়া সফরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির *** এল ক্লাসিকোর আগে চোটের মিছিলে ওলমোও, দুশ্চিন্তা বাড়ল বার্সার *** সাজেকে কাল থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ *** চট্টগ্রামে হিন্দু তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ২ *** ২৫ অক্টোবর থেকে রিয়াদে ফ্লাইট শুরু করবে বিমান *** ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদের স্লোগান যে কারণে ‘বিসমিল্লাহ’ *** রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পিঁয়াজু, জুসসহ খাবারের ব্যবসা করতেও নিবন্ধন নিতে হবে, আপত্তি ব্যবসায়ীদের *** আবার চালু হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি, বাংলাদেশিরা কী আবেদন করতে পারবেন

সরকার চায় শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থাকুন, আল জাজিরাকে বিশেষজ্ঞরা

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ১১:১৯ অপরাহ্ন, ২৫শে আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি তারেক রহমান সরকার হয়তো তাকে দেশে ফেরত না পাওয়াকেই রাজনৈতিকভাবে বেশি সুবিধাজনক মনে করছে—এমন অভিমত দিয়েছেন দেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক ডেভিড বার্গম্যান। তার মতে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না জেনেও ঢাকা এই দাবি করছে মূলত দেশের জনমতকে সন্তুষ্ট করার জন্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, ঢাকার অবস্থানকে সরলভাবে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বাংলাদেশকে একই সঙ্গে নিজের আইনি ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। 

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্ক যতই বহুমুখী করুক, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব কমবে না।

আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস শেখ হাসিনাকে ঘিরে থমকে গেছে: অচলাবস্থা ভাঙবে কীভাবে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েন এবং প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তার পেছনে শেখ হাসিনা ইস্যুর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এতে তিন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জনমত, সার্বভৌমত্ব এবং ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের হিসাবও জড়িয়ে আছে।

সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার দাবি এবং তাকে দেশে না পাওয়ার রাজনৈতিক সুবিধা—দুটি বিষয় একই সঙ্গে কাজ করতে পারে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জানে যে ভারত সরকার কখনোই শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না। তারপরও তারা এই দাবি করছে।’ তার মতে, এর একটি উদ্দেশ্য বাংলাদেশের জনমতকে সন্তুষ্ট করা।

বার্গম্যানের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে ফেরার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে হেফাজতে রাখতে হবে। তাকে কারাগারে রাখা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রশ্ন—সবকিছুই সরকারের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ফলে প্রত্যর্পণের দাবি রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় হলেও বাস্তবে হাসিনার দেশে ফিরে আসা সরকারের জন্য কতটা সুবিধাজনক, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তবে শাহাব এনাম খান মনে করেন, শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানকে শুধু ভারতবিরোধী নীতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির জটিলতা বোঝা যাবে না। তার মতে, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ভারত এখনও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঢাকার সামনে একদিকে যেমন নিজের আইনি ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক বজায় রাখার বাস্তবতা।

তার বিশ্লেষণে, বর্তমান অবস্থানের পেছনে দুটি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমটি বাংলাদেশের আইনি ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। দ্বিতীয়টি হলো, গত দেড় দশকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া মনোভাব। তার মতে, ভারত দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে সমর্থন করেছে এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে নয়াদিল্লির কিছুটা সময় লেগেছে।

তবে শাহাব এনাম খান মনে করেন, ভারতের অবস্থানে পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। তার ভাষায়, ভারত এখন ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ক্রমেই গ্রহণ করছে’। কিন্তু শুধু অবস্থান পরিবর্তনের কথা বললেই হবে না; ঢাকা সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন বাস্তব পদক্ষেপে দেখতে চায়। অর্থাৎ দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কেন্দ্রে শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নয়, বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ভারত কতটা গ্রহণ করছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শ্রীরাধা দত্তের বিশ্লেষণে আবার দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তার মতে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। এসব উদ্যোগ ভারতের উদ্বেগ বাড়ালেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বহুমুখী করার প্রচেষ্টা ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারছে না।

বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন শ্রীরাধা। তার মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতির হিসাব-নিকাশে চীনের ভূমিকা বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য কাঠামোগতভাবে থেকে যাচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘দুই পক্ষই দীর্ঘ সময় একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে পারবে না।’ তার মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্বার্থ দুই দেশকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে বাধ্য করবে। বাংলাদেশের জন্য ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। একইভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় স্বার্থের জন্যও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ককে ৭০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ব্যবস্থা সমর্থন করছে।

এই বাস্তবতাই ব্যাখ্যা করে, শেখ হাসিনা ইস্যুতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলেও বাংলাদেশ ও ভারত কেন সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার পথে হাঁটছে না। চলতি মাসে ভারতের কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে সরকারের মন্ত্রী ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ চালু রয়েছে।

দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও এই বাস্তবতার বড় উদাহরণ। বছরে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ বছরে প্রায় ১০ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ যতই তীব্র হোক, অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই দেশকে যোগাযোগ বজায় রাখতে বাধ্য করছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারেক রহমানের জন্য ভারতের আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী’ সম্পর্ক চাওয়ার কথা জানিয়েছে।

তিন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য মিলিয়ে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা হলো—শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলেও দুই দেশের সম্পর্কের কাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বার্গম্যান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দ্বিধার দিকে নজর দিয়েছেন, শাহাব এনাম দেখিয়েছেন সার্বভৌমত্ব ও বাস্তব কূটনৈতিক প্রয়োজনের মধ্যে ঢাকার ভারসাম্যের চেষ্টা, আর শ্রীরাধা তুলে ধরেছেন ভৌগোলিক ও কৌশলগত পারস্পরিক নির্ভরতা।

ফলে অচলাবস্থা ভাঙার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা হবে কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং এমন কোনো প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য সমঝোতা তৈরি করা যায় কি না, যাতে বাংলাদেশ নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে মনে না করে এবং ভারতও তার আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে তারেক রহমানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এগিয়ে নিতে পারে—সেটিই এখন দুই দেশের সম্পর্কের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেখ হাসিনা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250