রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে সরকারপন্থী সবচেয়ে বড় সমাবেশ, লাখো মানুষের উপস্থিতি *** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের

সুখবর এক্সপ্লেইনার

স্পেন সীমান্তে হঠাৎ কেন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল, কী ঘটছে সেখানে

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন, ১লা আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয়তা, আদালতের সাম্প্রতিক একটি রায় এবং স্পেন–মরক্কো কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে ইউরোপের দক্ষিণ সীমান্তে নতুন এক অভিবাসন সংকটের জন্ম দিয়েছে। উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর উপকূলে অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় কয়েক দিনের মধ্যে কয়েক দশক হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর ঢল নেমেছে। 

স্থলসীমান্ত, কাঁটাতারের বেড়া ও সমুদ্রপথ পেরিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে প্রবেশের মরিয়া চেষ্টায় অন্তত ৫৭ জনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি কেবল একটি সীমান্ত সংকট নয়; বরং ইউরোপের অভিবাসননীতি, মরক্কোর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ইউরোপ–উত্তর আফ্রিকা সম্পর্কের জটিল সমীকরণের বহিঃপ্রকাশ।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, প্রায় ৮০ হাজার মানুষের শহর সেউতায় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ প্রবেশ করেন। পরিস্থিতি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। অনেকেই সাঁতরে, আবার অনেকে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। পরে স্পেন ও মরক্কো যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয় এবং হাজার হাজার মানুষ আবার মরক্কোয় ফিরে যেতে শুরু করেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, এই অভিবাসন ঢলের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি ধারণা—স্পেনে পৌঁছাতে পারলে আর সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠানো হবে না। এই ধারণার পেছনে ছিল স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়। 

আদালত বলেছেন, সমুদ্রপথে আটক হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না; প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তবে আদালতের এই রায়কে অনেকেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রচার চালায় যে, সেউতায় পৌঁছাতে পারলেই ইউরোপে থেকে যাওয়ার সুযোগ মিলবে। রয়টার্স বলছে, মানবপাচারকারী চক্র এবং দালালরা এই ভুল ধারণাকে আরও উসকে দেয়।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপি–এর ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণেও একই চিত্র উঠে এসেছে। এপি বলছে, স্পেনের অভিবাসন বৈধকরণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। অনেকের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায়, এখন স্পেনে পৌঁছাতে পারলেই বৈধ হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে ওই কর্মসূচি কেবল আগে থেকে নির্দিষ্ট সময় ধরে স্পেনে বসবাসকারীদের জন্য প্রযোজ্য; নতুন করে সীমান্ত অতিক্রমকারীদের জন্য নয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব বহু মানুষকে জীবন বাজি রেখে সীমান্তে ছুটে যেতে উৎসাহিত করেছে।

তবে শুধু গুজব দিয়ে এই বিপুল ঢল ব্যাখ্যা করা যায় না। রয়টার্স, এএফপি এবং ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনগুলোতে মরক্কোর গভীর অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। দেশটিতে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সীমিত কর্মসংস্থান এবং নিম্ন আয়ের কারণে বহু তরুণের কাছে ইউরোপই উন্নত জীবনের একমাত্র সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, অনেক তরুণ আগেই সাঁতার শেখা, ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ কেনা এবং সীমান্ত অতিক্রমের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ আকস্মিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির সুযোগ পেয়েই তারা সীমান্তে নেমে পড়েন।

সেউতা ও মেলিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত, যা আফ্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তাই বহু বছর ধরেই এই দুটি শহর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে যাওয়ার প্রধান প্রবেশপথ। উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত হলেও প্রশাসনিকভাবে এগুলো স্পেনের অংশ। ফলে সেউতার মাটিতে পা রাখা মানেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে প্রবেশ। এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই সেউতাকে অভিবাসীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, সেউতায় এর আগেও অভিবাসন সংকট দেখা গেছে, বিশেষ করে ২০২১ সালে। তখনও স্পেন ও মরক্কোর কূটনৈতিক উত্তেজনার সময় সীমান্তে নজরদারি শিথিল হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এবারের ঘটনাতেও অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা শুরুতে কেন এতটা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। যদিও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং মরক্কো সরকারও অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রয়টার্সও বলছে, কয়েকজন পর্যবেক্ষক মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে মরক্কো অসন্তুষ্ট হতে পারে। আবার পশ্চিম সাহারা প্রশ্নেও অতীতে দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়েছিল। তবে এসব বিষয়ে কোনো সরকারি স্বীকৃতি বা নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। ফলে বিষয়টি এখনো বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণের পর্যায়েই রয়েছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পরিস্থিতিকে "অপ্রত্যাশিত" বলে বর্ণনা করেছেন। সেউতা সফর করে তিনি বলেছেন, মাদ্রিদের নিরাপত্তার মতোই সেউতার নিরাপত্তাও স্পেনের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, গত বছর স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছিল। ফলে কয়েক দিনের মধ্যে এমন বিপুল মানুষের ঢল দেশটির জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সীমান্তে সেনা, সিভিল গার্ড এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি মরক্কোর সঙ্গে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও শুরু করেছে স্পেন।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৩১ জুলাই) পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেছেন। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলছে। তবে এত মানুষের আগমন স্থানীয় অবকাঠামো, আশ্রয়কেন্দ্র এবং প্রশাসনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবশ্য ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে। তাদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন শোনার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ও মূলত সেই আইনি নীতিকেই পুনর্ব্যক্ত করেছে। আদালত বলেছেন, সমুদ্রে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে "তাৎক্ষণিক ফেরত" নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

অন্যদিকে, স্পেনভিত্তিক অভিবাসনবিষয়ক সংগঠন স্যুর একোগ–এর পরিচালক হোসে মিগেল মোরালেস এল পাইসকে বলেন, প্রতি গ্রীষ্মেই সেউতায় অভিবাসন বেড়ে যায়। তাই প্রতিবার এটিকে শুধু জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তার মতে, সেউতার আশ্রয় ও সামাজিক সেবাব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করা ছাড়া এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে।

ইউরোপীয় রাজনীতিতেও ঘটনাটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় মরক্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ফ্রান্স সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে এবং ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের সহায়তার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে ইতালি ও ডেনমার্ক আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে মানবিক দায়বদ্ধতা ও সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে—সেটিই এখন ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সেউতার এই সংকট থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য সীমান্ত পরিস্থিতিকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভয়াবহ রূপ দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট সমাধান না হলে কেবল সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বা নিরাপত্তা বাড়িয়ে অভিবাসন ঠেকানো সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, স্পেন ও মরক্কোর মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক সম্পর্ক অভিবাসন পরিস্থিতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে সেউতার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা নয়; এটি ইউরোপের অভিবাসন নীতির কার্যকারিতা, উত্তর আফ্রিকার সামাজিক–অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক কূটনীতির জটিল আন্তঃসম্পর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আপাতত স্পেন ও মরক্কো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। কিন্তু যেসব কারণ মানুষকে জীবন বাজি রেখে সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য করছে—দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্য, সংঘাত এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা—সেগুলোর সমাধান না হলে সেউতার মতো সীমান্তগুলোতে এমন সংকট ভবিষ্যতেও বারবার ফিরে আসতে পারে।

স্পেন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250