ছবি: সংগৃহীত
প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে আরও বিস্তৃত করার প্রত্যয়ে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৭তম লন্ডন বাংলা বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব। গত ১০ ও ১১ অক্টোবর পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টার এবং রমফোর্ডের মে ফেয়ার ভেন্যুতে দুই দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। বই, কবিতা, আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে উৎসবটি পরিণত হয় প্রবাসে বাঙালির সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে অংশ নেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার প্রতিনিধি, কবি ও সাহিত্যিকেরা। বইমেলাকে কেন্দ্র করে পাঠক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয় যোগাযোগের সুযোগ। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, বাংলা সাহিত্যের বৈচিত্র্য এবং প্রবাসে মাতৃভাষার চর্চা—সব মিলিয়ে উৎসবের আয়োজনজুড়ে ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ।
বইমেলার প্রথম দিনে ছিল বই প্রদর্শনী ও বিক্রির আয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, আবৃত্তি সংগঠন ছান্দমিক এবং ব্যান্ড গোধূলি। নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যদল তালতরঙ্গ। শিশুদের পরিবেশনা থেকে শুরু করে সংগীত ও নৃত্যের বিভিন্ন আয়োজন উৎসবের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
শুধু বই কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না এবারের বইমেলা। সাহিত্যচর্চাকে পাঠকের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল কবি-সাহিত্যিকদের স্বরচিত কবিতা পাঠের বিশেষ আয়োজন। এতে কবিরা নিজেদের লেখা কবিতা পাঠ করেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য আলোচনা। লেখালেখি, কবিতার বিষয়বস্তু ও সাহিত্যচর্চার নানা দিক নিয়ে এ ধরনের আয়োজন লেখক ও পাঠকের মধ্যে ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি করে।
দ্বিতীয় দিনে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রমফোর্ডের মে ফেয়ার ভেন্যুতে আয়োজিত মেগা কনসার্ট। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে কনসার্টের সূচনা হয়। এরপর সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও ফেরদৌস ওয়াহিদ। তাদের পরিবেশনা ঘিরে কনসার্টে সংগীতপ্রেমীদের জন্য তৈরি হয় বিশেষ আকর্ষণ। বাংলা গানের দুই পরিচিত শিল্পীর অংশগ্রহণে বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের দ্বিতীয় দিনের আয়োজন পায় আলাদা মাত্রা।
দুই দিনের উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বইমেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ও উদীচীর সভাপতি গোলাম মোস্তফা। তিনি উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা পাঠ করেন। পুরো আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুর রহমান তরফদার। আয়োজকদের সমন্বিত উদ্যোগে বইমেলা, সাহিত্য আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দুই দিনের কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।
উৎসবে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের একটি বাণী পাঠ করা হয়। তার এ বাণী পাঠের মধ্য দিয়ে আয়োজনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে প্রবাসের যোগসূত্রও উঠে আসে।
দুই দিনব্যাপী উৎসবে সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির বিভিন্ন পরিবেশনা পরিচালনা করেন উদীচীর ড. শ্যামল চৌধুরী, শ্রীপর্ণাদেব সরকার, চায়না চৌধুরী, মুনিরা পারভিন এবং হাসান তারেক। তাদের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনাগুলো উৎসবের কর্মসূচিতে বৈচিত্র্য যোগ করে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সেলিনা শেলী, কিশোর মুনিয়া, এরিনা সিদ্দিক এবং পলি কর।
লন্ডন বাংলা বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের ১৭তম আয়োজন প্রবাসে বাংলা বই ও সংস্কৃতিকে ঘিরে একটি সম্মিলিত পরিসর তৈরি করেছে। একদিকে প্রকাশনা সংস্থা, কবি ও সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে বই ও সাহিত্য নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ, অন্যদিকে সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও শিশুদের পরিবেশনা—দুই ধারার সমন্বয়ে উৎসবটি সাজানো হয়। কবিতা পাঠ ও সাহিত্য আলোচনা থেকে শুরু করে কিংবদন্তি শিল্পীদের কনসার্ট পর্যন্ত নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবাসী বাঙালির আগ্রহের প্রকাশ ঘটেছে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা, সাংস্কৃতিক কর্মীদের অংশগ্রহণ এবং শিল্পীদের পরিবেশনায় সম্পন্ন হয় দুই দিনব্যাপী এ উৎসব। ১৭তম লন্ডন বাংলা বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে ঘিরে লেখক, পাঠক, শিল্পী ও দর্শকদের একত্র হওয়ার আরেকটি উপলক্ষ তৈরি হয়।
খবরটি শেয়ার করুন