রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে সরকারপন্থী সবচেয়ে বড় সমাবেশ, লাখো মানুষের উপস্থিতি *** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের

সুখবর এক্সপ্লেইনার

প্রাণহানির ঝুঁকি থাকলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে না মালয়েশিয়া

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০২:৩৭ পূর্বাহ্ন, ৬ই আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকলে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো হবে না—মালয়েশিয়া সরকারের এমন ঘোষণা নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ছে। কয়েক দিন আগেও কুয়ালালামপুরের অবস্থান ছিল ভিন্ন ধরনের। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত ৩০ জুলাই জানিয়েছিলেন, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।

তবে মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সমালোচনার মুখে এখন মালয়েশিয়া সরকার নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া কোনো প্রত্যাবাসন না করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যদি দেখা যায় মিয়ানমারে ফিরে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তাহলে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে না। তার ভাষায়, প্রত্যাবাসনের আগে সব ধরনের মানদণ্ড, শর্ত এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকটের ইতিহাস বিবেচনায় মালয়েশিয়ার এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই অভিযানে গণহত্যা, জাতিগত নিধন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তোলে। সেই সময় থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ মালয়েশিয়ায় বসবাস করছে। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে মালয়েশিয়াকে তারা তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে বড় অংশই মিয়ানমার থেকে যাওয়া এবং তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা। তবে সমস্যা হলো, মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন কিংবা ১৯৬৭ সালের প্রোটোকলে স্বাক্ষরকারী নয়। ফলে দেশটির আইনে শরণার্থীদের জন্য আলাদা কোনো স্বীকৃত কাঠামো নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আশ্রয়প্রার্থীদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই বাস্তবতাই বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে, অন্যদিকে দেশটির অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাবও বাড়ছে। সম্প্রতি রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক প্রচারণা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার কারণে দেশটিতে তাদের পরিচালিত বেশ কয়েকটি কমিউনিটি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে এবং অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, মালয়েশিয়া ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের জন্য কয়েক হাজার মিয়ানমার নাগরিকের পরিচয় যাচাই ও নথিপত্র পরীক্ষা শুরু করেছে। তবে সেখানে আরেকটি জটিলতা রয়েছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজেদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মানতে চায় না। ফলে কাদের ফেরত নেওয়া হবে এবং কী পরিচয়ে নেওয়া হবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শুরু থেকেই এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছে। সংস্থাটি বলছে, বর্তমানে মিয়ানমারে সামরিক শাসন বহাল রয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত আছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ বা জোরপূর্বক এমন স্থানে কাউকে ফেরত না পাঠানোর নীতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজ দেশে ফিরে নির্যাতন, নিপীড়ন বা প্রাণহানির ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে তাকে সেখানে ফেরত পাঠানো উচিত নয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে সংস্থাটির অবস্থান তুলে ধরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি এখনো নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক আইনে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার বর্তমান অবস্থানকে দ্বৈত চাপের ফল হিসেবে দেখা যেতে পারে। একদিকে দেশটির ভেতরে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জনমত ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয় জনগণের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কুয়ালালামপুরের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে সরকারকে মানবিক দায়বদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্যও এই ঘটনাপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বর্তমানে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে অবস্থান করছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বারবার বলেছে, মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। মালয়েশিয়ার বর্তমান দ্বিধা সেই যুক্তিকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। যদি মালয়েশিয়ার মতো দেশও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না চায়, তাহলে বোঝা যায় মিয়ানমারে এখনো প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সম্ভব, তবে সেই প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ পরিবেশে এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন কার্যকর হবে না। অন্যথায় তারা আবারও নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি কিংবা সহিংসতার শিকার হতে পারে।

মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই শুধু পাঁচ হাজার রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। দেশটি যদি সত্যিই নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

কিন্তু যদি অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে দ্রুত প্রত্যাবাসনের পথে এগোয়, তাহলে নতুন মানবিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আপাতত কুয়ালালামপুরের সর্বশেষ বার্তা হলো—জীবনের ঝুঁকি থাকলে কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে না। এখন দেখার বিষয়, বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকরভাবে রক্ষা করা হয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250