শনিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ঢামেকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ আসিফ নজরুল, বেরোলেন বাগান গেট দিয়ে *** কাকরাইলে দুটি রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আইএসপিআরের বক্তব্য *** আসিফ নজরুলকে 'ভণ্ডামি বাদ দিতে' বললেন হাসনাত আবদুল্লাহ *** অনলাইনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে জেল ও জরিমানা *** মুরগি খাওয়া রোধে পাতা ফাঁদে ধরা পড়ল মেছো বাঘ *** আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সময় তাহলে ফুরিয়ে এল *** লতিফ সিদ্দিকী যা বললেন আদালতে *** ভারতে ইসলাম থাকবে, মানিয়ে নিতে শিখুন: আরএসএস প্রধান *** আটকের ১২ ঘণ্টা পর মামলা লতিফ সিদ্দিকী, শিক্ষক কার্জনসহ ১৬ জন কারাগারে *** নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জুতার মালা ও জেলের কথা মনে করিয়ে দিলেন ইসি

জনকণ্ঠের ঘটনার নেপথ্যে আসলে কী

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:১৪ অপরাহ্ন, ৪ঠা আগস্ট ২০২৫

#

ছবি: বিবিসি বাংলা

দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে নিজেরাই একটি সম্পাদকীয় বোর্ড গঠন করেছে পত্রিকাটির একদল কর্মী, যারা গত বছরের ৫ই আগস্টে আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর বিভিন্ন সময়ে পত্রিকাটিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন। গত শনিবার (২রা আগস্ট) তাদের কয়েকজনকে মালিকপক্ষ চাকুরিচ্যুত করার পর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সম্পাদককে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা ছাড়াও তারা মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে ঢাকার হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।

জনকণ্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক শামীমা এ খান শনিবার রাতে ষড়যন্ত্র করে জনকণ্ঠ ভবনে 'মব সৃষ্টি করে অবৈধভাবে দখলের' অভিযোগ করেছেন। তার এই অভিযোগ গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের চিফ অপারেটিং অফিসার ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর আফিজুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহবায়ক ও পত্রিকাটির প্লানিং এডভাইজর জয়নাল আবেদীন শিশিরসহ বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। তবে আফিজুর রহমান ও জয়নাল আবেদীন শিশির উভয়েই বিবিসি বাংলার কাছে জনকণ্ঠ দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জনকণ্ঠের ওই ঘটনার পর থেকে জাতীয় পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকরা ক্ষোভ জানাচ্ছেন, প্রতিবাদ করছেন, অভিমত ব্যক্ত করছেন। সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। জ্যেষ্ঠ থেকে শুরু করে তরুণ এসব সাংবাদিক ফেসবুকসহ অনলাইন-কেন্দ্রিক অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে লিখছেন। তাদের মতামত ও বক্তব্যে উঠে আসছে জনকণ্ঠের ঘটনার নেপথ্য কারণ।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল গতকাল ফেসবুকের এক পোস্টে বলেন, 'দৈনিক জনকণ্ঠ নিয়ে সকাল থেকেই নানা খবর পাচ্ছি। পত্রিকাটির অনলাইনে গিয়ে দেখি- প্রিন্টার্স লাইন পাল্টে গেছে। সম্পাদক বা প্রকাশকের নামই নেই। এর পরিবর্তে সম্পাদকমন্ডলী লেখা! একটা নিউজের শিরোনাম এমন- ফ্যাসিবাদমুক্ত করা হয়েছে জনকণ্ঠ। এই নিউজের মধ্যে একটা পরিচালনা বোর্ড গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এখন থেকে তারাই নাকি পত্রিকাটি চালাবে। তারা কারা? যতদূর বুঝলাম- এনসিপি, জামায়াত, বিএনপি সবাই আছে এখানে।'

তিনি লেখেন, 'জনকণ্ঠ একটা ব্যক্তিমালিকানধীন প্রতিষ্ঠান। ঢাকার ইস্কাটনের বিশাল এই ভবনে জনকণ্ঠ ছাড়াও মালিকের আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। কোনো পত্রিকা ফ্যাসিবাদের দোসর হলে, কোনো অপরাধ করলে তার বিচারের জন্য বিধিবদ্ধ কিছু আইনকানুন আছে। কিন্তু এভাবে জবরদখল করা যায়? ওখানে আসলে ঠিক কী ঘটেছে, কেন ঘটছে- ঠিক বুঝতে পারছি না। খোঁজখবর নিচ্ছি।... জনকণ্ঠের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। এ পত্রিকার শুরু থেকে টানা ১২ বছর আমি সেখানে ছিলাম। তাই ঘটনাগুলো আমাকে বিচলিত করছে।'

প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক (ডিজি) সাংবাদিক ও লেখক ফারুক ওয়াসিফ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, 'জনকণ্ঠের যে ২০ জন সাংবাদিককে সম্পূর্ণ অন্যায্য কারণে চাকরিহারা করা হলো, তারা আর আগের মতো অসহায় হয়ে থাকতে চাননি। এতটুকু, এই এতটুকু সাহস আর আত্মমর্যাদা জুলাইয়েরই অর্জন। রাষ্ট্র কাজে জুলাই ততটা সফল না হলেও, মানুষকে মানুষের মতো বাঁচার প্রেরণা হওয়ায় জুলাই সফল। তাই জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের চাকরি খাওয়া যাবে না।'

তিনি বলেন, 'কে কালো কে লাল তার সাথে অন্যায়ভাবে চাকরি খাওয়ার সম্পর্ক নেই। মতামতের জন্য চাকরি যেতে পারে না নতুন বাংলাদেশে। জনকণ্ঠের ইতিহাস ও বর্তমান আমরা জানি। এক্সপ্লোর জনকণ্ঠের অন্দরমহল। কিন্তু কোনোরকম মবগিরি সমর্থন করি না। মবগিরি আন্দোলন ও ঐক্য নষ্ট করে দেয়।'

জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সালাহ উদ্দিন জসিম বলেন, 'জনকণ্ঠ নিয়ে যারা মায়াকান্না করছেন, না জেনেই করছেন৷ জনকণ্ঠের এই পরিস্থিতি মালিকপক্ষ কর্তৃক কৌশলে তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের ঋণখেলাপি। যে কোনো মুহুর্তে নিলামে উঠতে পারে ভবন। এদিকে, বছরের পর বছর পুরনো কর্মীদের বেতন-ভাতা দেয়নি। তারা বেশ কয়েকদিন আন্দোলনও করেছেন। এরই মধ্যে নতুন কিছু কর্মী নিয়েছে, তাদের দিয়ে প্রতিষ্ঠান চলমান রাখতে। সফলও হয়েছে।'

তিনি বলেন, 'কিন্তু বাঁধ সাধে সেই বেতন। জনকণ্ঠ তো এমন পত্রিকা- ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল দেবার গোসাই। নতুনদেরও বেতন দিতে পারছিল না। এর মধ্যে আছে, পিতা (জনকণ্ঠের সাবেক সম্পাদক ও প্রকাশক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ) মারা যাওয়ার পর সন্তানদের মধ্যে বিরোধ। টাকা না দিতে পারলেও যে যার মতো চালাতে চায় পত্রিকাটি। ঝামেলা এখানেই। মা (সম্পাদক) কতক্ষণ আর বুড়ো ছেলেদের আগলে রাখতে পারেন?'

জনকণ্ঠে কর্মরত সাংবাদিক ইসরাফিল ফরাজী এ প্রসঙ্গে 'জুলাইকে হারতে দেইনি, আমাদের জুলাই চলবে...' শিরোনামে গতকাল রোববার (৩রা আগস্ট) একটি পোস্ট দেন ফেসবুকে। তিনি লেখেন, 'গতকাল (শনিবার) জনকণ্ঠ নিয়ে যা হয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলাতে যাবেন না কেউ। আমি দৈনিক যুগান্তর ছেড়ে জনকণ্ঠে আসি, এর পেছনে একটা লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক ফ্যাসিবাদমুক্ত করে জনকণ্ঠকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া। আমি চব্বিশের নভেম্বরে জনকণ্ঠে আসি। তারপর থেকে আব্দুর রহিম, জাহিদ, নাজমুল ভাইকে জনকণ্ঠে যুক্ত করি। একটা সময় জয়নাল আবেদিন শিশির ভাইকে জনকণ্ঠ নিয়োগ করে। গত ৮ মাসে বারবার জনকণ্ঠের সম্পাদক শামীমা এ খানের সঙ্গে বসার চেষ্টা করি। তিনি অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ৮ মাসে একবারও আমাদের সঙ্গে বসেননি।'

তিনি বলেন, 'জনকণ্ঠ সম্পাদকের ছেলে জিসাল এ খান (প্রতিষ্ঠানের ভিসি-২) আওয়ামী লীগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আগস্ট মাসব্যাপী শোক পালন করতে চাইলেন, তখন আমরা এর বিরোধিতা করি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও জনকণ্ঠ পরিবারের কেউ যোগাযোগ করেনি। পরশু রাতে তাদের একজন পরিচালক জাকির হোসেনকে পাঠান আমাদের সঙ্গে বসার জন্য। যখন আমরা আলোচনায় বসি, তখন জাকির তার সঙ্গে ৩০-৩৫ জনকে নিয়ে আসেন। আওয়ামী লীগের পক্ষে শোক পালনের কথা তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উলটো প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন, এটা মালিকের সিদ্ধান্ত, আমার-আপনার কী বলার আছে! আলোচনার এক পর্যায়ে তারা আমাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। থামতে বলায় তার সঙ্গে থাকা লোকজন আমাদের ওপর হামলা করেন।'

ফরাজী বলেন, 'যদি জনকণ্ঠ দখল করা বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ইন্ধন থাকত, তাহলে পুলিশ আমাদের মামলা নিতে গড়িমসি করতো না। অনেকে শিশির ভাইকে এনসিপির ট্যাগ দিয়ে আমাদের এই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। অনুগ্রহ করে ট্যাগিং বন্ধ করুন। এনপিপি থেকে বা অন্য কোনো দল থেকে আমরা সহযোগিতা চাইনি। গতকাল যদি আমরা বুক চিতিয়ে এই দোসরদের বিরুদ্ধে না দাঁড়াতাম, তাহলে দেশে এখনও যেসব মিডিয়া আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তারা আরও সাহস পেয়ে যেত। আমরা হেরে গেলে জুলাই হেরে যেত।'

গণমাধ্যম সাংবাদিক জনকণ্ঠ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন