রবিবার, ২৫শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ফের সোনার দামে বড় পতন, ভরিপ্রতি যত হলো *** জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন গতির আশা *** ফ্রান্সে ৪ লাখ মানুষের বিক্ষোভ, বাড়ছে উত্তেজনা–সংঘর্ষ *** আজই ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প *** সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের নিয়ম-কানুন পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এইচএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর *** টঙ্গীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ *** তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব *** সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিকের লাশ দাফনে বাধা, গোপনে গার্ড অব অনার *** মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী করে এসি ল্যান্ডের ফেসবুক পোস্ট, পরিবারের দাবি মানসিক সমস্যা

এবার সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ১১:৫৫ অপরাহ্ন, ৯ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল দায়িত্ব নেওয়ার আগে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতি সংস্কার নিয়ে যেসব প্রত্যাশা করেছিলেন, দায়িত্বে গিয়ে তার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সম্প্রতি একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

ভিডিওতে দেখা যায়, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরে নীতিনির্ধারকদের অভিজ্ঞতার পার্থক্যের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, দায়িত্বে যাওয়ার আগে অনেকেরই ধারণা থাকে যে সুযোগ পেলে দ্রুত অনেক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রশাসনিক বাস্তবতা, আইনি কাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে সেই পরিকল্পনার সব বাস্তবায়ন করা যায় না।

এই প্রসঙ্গেই তিনি ড. আসিফ নজরুলের উদাহরণ টেনে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার আগে তারও অনেক পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরে তিনি নিজেই উপলব্ধি করেছেন, যেসব কাজ করার কথা ভেবেছিলেন, তার উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আসিফ নজরুল দায়িত্ব পালনকালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তিনি যা ভেবেছিলেন বাস্তবে তার অনেকটাই করা সম্ভব হয়নি।

একই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকেও মতামত জানতে চান। তখন এক প্রশিক্ষণার্থী জানান, তিনি দুই দফায় ওই প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন—প্রথমবার ১৯৯৯ সালে এবং দ্বিতীয়বার ২০১২ সালে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কিছু সেশনের মান প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল না। পাশাপাশি আবাসন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও তার নজরে এসেছিল।

ওই প্রশিক্ষণার্থী বলেন, প্রায় ২৬–২৭ বছর আগের স্মৃতিতে ফিরে গেলে তার মনে হয়, প্রশিক্ষণের কিছু সেশনের মান আরও উন্নত হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এর বাইরে নির্দিষ্টভাবে আর তেমন কিছু মনে নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ এটিকে দায়িত্ব পালনের বাস্তবতা সম্পর্কে একজন মন্ত্রীর অকপট মূল্যায়ন হিসেবে দেখেছেন। আবার কেউ মনে করছেন, এটি সাবেক উপদেষ্টার কর্মদক্ষতা নিয়ে পরোক্ষ সমালোচনা।

ড. আসিফ নজরুল অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালে আইন, বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছিলেন। তবে একই সময়ে তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, সরকার পরিচালনা বাইরে থেকে যত সহজ মনে হয়, ভেতরে এসে তা ততটা সহজ নয়। এমনকি দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সময়ে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং চাপের মুখেও কাজ করতে হয়েছে।

দায়িত্ব ছাড়ার পরও ড. আসিফ নজরুলকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে আসে। দেশের বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারিক পদায়ন ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলিকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগগুলোতে তদন্তের আবেদন করা হলেও সেগুলো অভিযোগ পর্যায়েই রয়েছে এবং তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। দুদকও জানিয়েছে, তাদের কাছে জমা পড়া প্রতিটি অভিযোগ প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।

অন্যদিকে অতীতেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, যার কিছু পরবর্তীতে বিভ্রান্তিকর বা পুরোনো বক্তব্যের অপব্যবহার বলে চিহ্নিত হয়েছে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট বাংলাফ্যাক্ট একটি ঘটনায় জানিয়েছিল, তার পুরোনো বক্তব্য নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল।

এ ছাড়া একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে ড. আসিফ নজরুলের দপ্তর প্রকাশ্যেই 'মিথ্যা', 'মানহানিকর' ও 'ভিত্তিহীন' বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সে সময় তার দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কোনো নীতিনির্ধারকের ব্যক্তিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইন, বাজেট, প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার আগে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, বাস্তবে তার সঙ্গে প্রায়ই ব্যবধান দেখা দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী রায়হান কবির লিখেছেন, "ক্ষমতায় যাওয়ার আগে অনেকেই মনে করেন সব সমস্যার সহজ সমাধান আছে। কিন্তু দায়িত্বে গিয়ে বাস্তবতা ভিন্ন হয়।"

অন্যদিকে মাহমুদা ইসলাম মন্তব্য করেন, "যদি বাস্তবতা এত কঠিন হয়, তাহলে দায়িত্ব নেওয়ার আগে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর সীমাবদ্ধতাও জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত ছিল।" নাঈম হাসান লিখেছেন, "শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং প্রশাসনের বাস্তব চিত্রই উঠে এসেছে বলে মনে হয়েছে।"

তবে সাব্বির রহমান ভিন্ন মত দিয়ে লেখেন, "একজন সাবেক উপদেষ্টাকে উদাহরণ হিসেবে টানার পরিবর্তে বর্তমান সরকারের করণীয় নিয়ে বেশি কথা বলা উচিত ছিল।" আরেক ব্যবহারকারী ফারজানা তাসনিম মন্তব্য করেন, "যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। আবার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে দোষী বলাও ঠিক হবে না।"

পর্যবেক্ষকদের মতে, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য নতুন করে একটি পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সদিচ্ছা কতটা কার্যকর, আর প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা কতটা বড় বাধা। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে কোনো নীতিনির্ধারকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে অভিযোগ সত্য হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, আর ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়মুক্তি পান।

সব মিলিয়ে, শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য কেবল ড. আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গই নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

আসিফ নজরুল আ ন ম এহছানুল হক মিলন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250