ছবি: সংগৃহীত
শিতাংশু ভৌমিক অংকুর
ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনা।এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে ভারতের প্রায় সব পণ্যের শুল্ক কার্যত শূন্যে নেমে আসছে। এর অর্থ খুব পরিষ্কার ইউরোপের বিশাল বাজারে ভারত এখন সরাসরি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন না হয়ে সুবিধাজনক জায়গা থেকে অর্থনৈতিক খেলা খেলবে।
প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়াচ্ছে? এই চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পে। ইউরোপে এতদিন ভারতীয় পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য শুল্ক দিতে হতো, তাই বাংলাদেশ তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এখন সেই সমীকরণ উল্টে যাচ্ছে। ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, এবং বাংলাদেশ এমন এক সময়ে সামনে এগোচ্ছে, যখন স্বল্পোন্নত দেশের বিশেষ সুবিধা হারানোর বাস্তবতা সামনে।
বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রায় শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা পায়, তবে এই সুবিধা শেষ হলে শুল্ক প্রায় নয় থেকে বারো শতাংশে উঠতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে এখন গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, যা নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে ধাপে ধাপে শূন্যে নেমে আসবে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা বিশেষ সুবিধার আওতায় ইউরোপে প্রায় শূন্য শতাংশ শুল্কে পোশাক রপ্তানি করে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে গার্মেন্টস শিল্প থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই খাতের সবচেয়ে বড় বাজার। প্রতি বছর ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই নির্ভরতার বিপরীতে প্রস্তুতি কতটা–সেটাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশে স্বল্প উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হচ্ছে। ফলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা আর আগের মতো থাকবে না। ঠিক তখনই ভারত শূন্য শুল্কে প্রবেশ করবে। প্রতিযোগিতা হবে অসম, এবং সেই অসমতার দায় বাংলাদেশকেই নিতে হবে।
এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের ওপর যোগ হয়েছে দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট। দীর্ঘদিন ধরে অস্থির রাজনীতি, রূপান্তরকালিন সরকারের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থতা, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের অনিশ্চয়তা, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের শঙ্কা এবং নানা অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। বিনিয়োগ থমকে আছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যে, এবং ব্যাংক খাত দুর্বল। এই বাস্তবতায় সামনে যে সরকারই নির্বাচিত হয়ে আসুক, তাদের সামনে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে ভয়াবহ কঠিন।
নির্বাচিত সরকারের সামনে একসঙ্গে অনেক বোঝা থাকবে, যেমন: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি কমানো, রাজস্ব বাড়ানো, ঋণের কিস্তি পরিশোধ, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং একইসঙ্গে রপ্তানি খাতকে নতুন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এসবের একটিও টেকসইভাবে করা সম্ভব নয়। অথচ আমাদের রাজনীতি এখনও বাস্তবত অর্থনীতি নির্ভর নয়, স্লোগানই মুখ্য।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক। ভারত স্পষ্ট করে বলেছে, নিজেদের বন্দর, লজিস্টিক সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার। এতে আবেগের কিছু নেই, রাজনীতিরও খুব বেশি নেই; এটা নিখাদ রাষ্ট্রীয় স্বার্থ। নেপাল ও ভুটানের ক্ষেত্রে সুবিধা বহাল রেখে কেবল বাংলাদেশের জন্য তা প্রত্যাহার দক্ষিণ এশিয়ার কঠিন বাস্তবতাই তুলে ধরে।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা নেই। এখানে এখনো ভারতবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, এই বক্তব্যে বাস্তবে কী অর্জন হয়েছে? ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি বাতিল হয়েছে? ভারতীয় পণ্য আমদানি বন্ধ হয়েছে? বিদ্যুৎ, খাদ্য বা নিত্যপণ্যে নির্ভরতা কমেছে? উত্তর পরিষ্কার না।
বরং উল্টোটা হয়েছে। আবেগী বক্তব্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান দুর্বল করার কারণে এবং ভারত নীরবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করে এগিয়ে গেছে। ইউরোপের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, লজিস্টিক নিয়ন্ত্রণ, চীনের সাথে মিলে আঞ্চলিক প্রভাব সব ক্ষেত্রেই তারা হিসাব করে চলছে। আর বাংলাদেশ এখনো রাজনৈতিক বাক-যুদ্ধে সময় অপচয় করছে।
আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া। গার্মেন্ট শিল্পে কম দামের পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্যের, নকশাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে। পরিবেশ ও শ্রমমান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক শর্ত পূরণে আর দেরি করার সুযোগ নেই। ইউরোপের বাইরে নতুন বাজার খুঁজতে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিজস্ব বন্দর, পরিবহন ও লজিস্টিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনীতি ও অর্থনীতিকে আলাদা করে দেখা যাবে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা রেখে স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়া যায় না এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি ছাড়া সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়াও সম্ভব নয়। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সময় থাকতে বাস্তবতা মেনে প্রস্তুত হবো, নাকি রাজনীতির মারপ্যাঁচে ভবিষ্যৎ হারাব?
লেখক: সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন