বুধবার, ২৮শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহারের সংকেত বুঝতে পারছে না সরকার *** ‘আমি কিন্তু আমলা, আপনি সুবিচার করেননি’ *** প্রধান উপদেষ্টার কাছে অ্যামনেস্টির মহাসচিবের খোলা চিঠি *** ভারত-ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি *** ‘গ্রিনল্যান্ড: মার্কিন হুমকি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়’ *** নতুন মার্কিন নীতি বাংলাদেশের উপর যে প্রভাব ফেলবে *** ‘কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ পুরুষদের সমকামী করে তুলতে পারে’ *** মুক্তিযোদ্ধা চাচাকে বাবা বানিয়ে বিসিএস ক্যাডার, সিনিয়র সহকারী সচিব কারাগারে *** নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না যুক্তরাষ্ট্র, খোঁজ-খবর রাখবে *** ‘প্রধান উপদেষ্টা ব্যস্ত, তাই ৩৩২ নম্বর এআইকে পাঠিয়েছেন’

নতুন মার্কিন নীতি বাংলাদেশের উপর যে প্রভাব ফেলবে

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৬:২৮ অপরাহ্ন, ২৮শে জানুয়ারী ২০২৬

#

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন, সেগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের ব্যবস্থাপনাতেই নয়, বিশ্বরাজনীতিতেও স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র নিজে ‘বিশ্বের অভিভাবক’ ভূমিকা থেকে সরে এসে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর বেশি দায়িত্ব দিতে চায়। যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি  আ ন ম মুনীরুজ্জামান।

ভারত শক্তিশালী হয়ে উঠলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কূটনৈতিকভাবে আবারো শক্তিশালী হওয়ার ‘সুযোগ’ দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা। তারা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও দলটির প্রতি ভারতের সমর্থনে কোনো ঘাটতি দেখা দেয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নীতির কারণে ভারত এই অঞ্চলে আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠলে আওয়ামী লীগের ‘পুনর্জাগরণের’ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা ভারতকে দলটির পক্ষে দূতিয়ালি করতেও দেখা যাচ্ছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ড–এর প্রযোজক উমর বিন জামাল টিআরটি ওয়ার্ল্ড–এর এক নিবন্ধনে সম্প্রতি উল্লেখ করেন, কয়েক দশক ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি ভারতকে ঘিরে আবর্তিত। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার ‘নিরাপত্তার রক্ষাকর্তা’ হিসেবে পরিচিত হতে চায়। দেশটি ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ প্রতিবেশী অঞ্চলের স্বাভাবিক নেতা হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে হিমালয় পর্যন্ত ভারতের হস্তক্ষেপ ও নীতির কারণে বিভিন্ন দেশে এক্ষেত্রে কিছু আপত্তি তৈরি হচ্ছে।

নির্ভরযোগ্য একাধিক কূটনৈতিক সূত্র সুখবর ডটকমের কাছে দাবি করেছে, আওয়ামী লীগকে ফের ‘শক্তিশালী’ করার বিষয়ে নয়াদিল্লি বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকদের নিয়ে এক ‘ক্লোজ ডোর মিটিং’ (রুদ্ধদ্বার বৈঠক) হয়েছে। ওই বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, বাংলাদেশে চলমান ভারতীয় প্রকল্প ও আওয়ামী লীগকে শক্তিশালীকরণ’।

বৈঠকে একাধিক বিশেষজ্ঞ মতামত দেন, প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সংকটকালে ভারতে দলীয় কর্মকাণ্ড করতে দেওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। তারা ভারতে আওয়ামী লীগের সংগঠিত হওয়ার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগ ভারতে বসে দল চালিয়েছে। নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলকাতায়।

দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগকে ছাড়া। ভারত শুরু থেকেই চেয়েছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও যাতে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এক্ষেত্রে ভারতের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তাই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠন হতে যাওয়া সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্ক কেমন হবে, এ নিয়েও নানা শঙ্কার কথা বলছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে না। মূলত একটি দেশে কতটা গণতান্ত্রিক চর্চা হচ্ছে তা বুঝতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর ফলে নির্বাচনের ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়ে না। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পর্যবেক্ষদের বিশেষ ভূমিকা থাকে। সূত্রের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগকে ছাড়া ‘অংশগ্রহণমূলক’ না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক ছিল না, নির্বাচনকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করতে ১২ই ফেব্রুয়ারির পর নয়াদিল্লি কূটনৈতিকভাবে এমন তথ্যও তুলে ধরতে পারে।

আগামী সংসদ নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু হেনা রাজ্জাকী। তিনি বলছেন, ১৯৯৬ সালে একটি নির্বাচন হয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বে, যেটা ২১ দিন টিকেছিল। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে এবং আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে হয়। তখন নির্বাচনটি আওয়ামী লীগকে ছাড়া হয়েছিল বলেই ২১ দিনের মাথায় আবার জাতীয় নির্বাচন দিতে হয়েছিল। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না সামনে কী হবে। তবে সব কূটনৈতিক মহলই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়।

তার মতে, সময়ের ব্যবধানে অনেক বিষয় প্রকাশ পাবে, এমনকি ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পরপরই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে আসতে পারে। আওয়ামী লীগ তিনটি নির্বাচন—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ কোনোটিই অংশগ্রহণমূলক করেনি। তারপরও তারা টিকে ছিল ভারতের সমর্থনে, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু নেক্সট গভর্মেন্ট (পরবর্তী সরকার) যদি মনে করে যে তারা আওয়ামী লীগের মতো তিন টার্ম চালাবে, এটা অবাস্তব।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের গত আগে গত শুক্রবার ‘ফরেন করেস্পডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া’ দিল্লিতে ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষা করো) শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার একটি রেকর্ড করা অডিও ভাষণ বাজানো হয়।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা প্রবল আপত্তির কথা জানায় দিল্লিকে। ভারতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ভাষণ নিয়ে এর আগেও আপত্তি তুলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু দিল্লি সেগুলো কানে নেয়নি। আওয়ামী লীগও যাতে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, দিল্লির ইচ্ছা সেটাই। এখানে  ভারতের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি, ঢাকা দিল্লির ইচ্ছা মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগসহ সব দলকে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন করছে না। ভারতের ইচ্ছা বাংলাদেশ শোনেনি, তাই দিল্লি এখন চাইছে শেখ হাসিনা তার বক্তব্য তুলে ধরুন।

২০২৪ সালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (যাকে এই অঞ্চলে ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখা হতো) ছাত্র নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারত স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেনি। এর পরিবর্তে নয়াদিল্লি বাংলাদেশিদের ভিসা স্থগিত করে, কূটনৈতিক তৎপরতা কমিয়ে দেয় এবং শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়।

তবে কারো কারো মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক এখন তলানিতে এসে ঠেকলেও ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোটের পরে যে দলের সরকারই আসুক না কেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উন্নতি ঘটাতে চাইবে দুটি দেশই।

ভারতের দিল্লিতে গত এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। জাতীয় নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগে পর পর দুই সপ্তাহে ভারতের রাজধানী শহরে আওয়ামী লীগ নেতাদের দুটি সংবাদ সম্মেলনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসাবে দেখা হচ্ছে। যদিও গত বছর দেড়েকে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এমনকি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিবিসিসহ অনেক ভারতীয় গণমাধ্যমকে ই-মেলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, দেশের মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের গণমাধ্যমই সব থেকে উপযুক্ত, তাই দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরাখবর বাংলাদেশের বহু মানুষ পড়ে থাকেন, তাই দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করলে সেই খবর দেশের মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে যাবে সহজেই। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য এটা তাদের একটি রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি  আ ন ম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতিতে বহুপক্ষীয় অঙ্গীকার ও গণতন্ত্র প্রচার থেকে সরে এসে স্বার্থনির্ভর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং মিত্রদের ওপর অধিক দায়ভার আরোপ করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই পরিবর্তনশীল মার্কিন কৌশল কীভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) ভূরাজনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করবে এবং বাংলাদেশে এর কেমন প্রভাব পড়বে?

তিনি বলেন, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। নতুন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো গণতন্ত্র ও মূল্যবোধ প্রচারে জোর দিচ্ছে না। বরং তারা এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়, যেখানে অন্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ কম থাকবে, যদি না তা সরাসরি মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তনের প্রভাব দ্বিমুখী। একদিকে এতে রাজনৈতিক চাপ ও শর্তারোপ কমতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কিছুটা স্বস্তি দেবে।

তার পরামর্শ, সব মিলিয়ে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশের সামনে একটি সুসংহত ও দূরদর্শী কৌশল গ্রহণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

মার্কিন নীতি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250