কামাল আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত
কামাল আহমেদ
যায়যায়দিন সাপ্তাহিকীতে তারিখ ইব্রাহিমের লেখা প্রায় নিয়মিতই পড়েছি, যেগুলোতে কোনো দলীয় ছাপ ছিল না, কিন্তু প্রগতিশীলতার প্রতিফলন ছিল। অনেক পরে যখন জেনেছ তিনি আসলে বিভুরঞ্জন সরকার, তখন অবাকই হয়েছি। কেননা, তখন আর লেখার ধারায় মিল পাইনি। পরে তার লেখা আর খুব একটা পড়া হয়নি। তিনি যে প্রকাশকের চাহিদামাফিক লিখতে পারতেন, তার প্রমাণ ভালোই মেলে।
তার সঙ্গে কখনো সামনাসামনি আলাপ হয়নি। তবে টেলিফোনে একবার কথা হয়েছে। উনি নিজের প্রয়োজনে ফোন করেননি, করেছিলেন মহিলা একটি নারী সংগঠনের একজন নেত্রীর হয়ে তাদের কোনো একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে।
শুক্রবার সকালে তার নিখোঁজ হওয়ার খবর পড়ে তার পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তার কোনো লেখার জন্য কোনো ঝামেলা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, না সে রকম কিছুই হয়নি। তিনি তখন অন্য একজনের লেখায় বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের জন্য সরকারের তরফে ফোন পাওয়ার পর লেখাটি প্রত্যাহারের কথাও জানালেন। ঘণ্টা কয়েক পর জানা গেল মেঘনায় তার মরদেহ পাওয়া গেছে। তার চিঠির কথাও জানলাম এবং পড়লাম।
তারপর থেকে ফেসবুকে যেসব আলোচনা মতামত দেখছি, তা অস্বস্তিকর ও দুঃখজনক। অস্বস্তির প্রথম কারণ তার চিঠির কিছু তথ্য, যেগুলো সব হয়তো যাচাই করা সম্ভব না। অস্বস্তির অন্য কারণ হচ্ছে, এই চিঠি অনেকের জন্যই বিব্রতকর। আর দুঃখজনক বিষয় হলো মৃত ব্যক্তি সম্পর্কেও অনেকে অসংবেদনশীল কথা বলছেন, যার অধিকাংশই অযৌক্তিক এবং কাম্য নয়।
আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলছি, কিন্তু তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে কলম ধরতেন বলেই তার সম্পর্কে কটুকথা বলতে ছাড়ছি না। রাজনৈতিক চিন্তামুক্ত সাংবাদিকতার ধারনাটা কি বাস্তবসম্মত? যদি তিনি সহিংসতাকে বাহবা দিয়ে থাকেন, ভিন্নমতের লোকদের নিপীড়ন-নির্যাতনে উৎসাহ দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটা অবশ্যই নিন্দনীয় ও অপরাধ হবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ভাষায় কোনো দল বা সরকারকে সমর্থন তো অপরাধ নয়। তিনি সহিংসতায় উসকানি দিয়ে কিছু লিখেছেন বলে আমার নজরে আসেনি।
সরকারের তরফে যদি কোনো সংবাদমাধ্যমকে হুমকি বা ধমক দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য কেউ প্রতিকার চাইতে ফোন করলে তাকে কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা স্বাধীন সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপ বলা যাবে?
বিভুরঞ্জন সরকার অর্থকষ্টের যে করুণ বিবরণ দিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার আলোচনাটা সামনে এসেছে। এটা খুবই জরুরি আলাপ। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে আমরা এ কথাই বলেছি।
সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের টেকসই ব্যবসায়িক নীতি নির্ধারণ এবং কালোটাকার মালিকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না গেলে সাংবাদিকতার বিদ্যমান সংকট কাটবে না বলে আমরা অনেকগুলো মৌলিক সংস্কারের সুপারিশ করেছি। কিন্তু, সরকারের দিক থেকে যেমন এ বিষয়ে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না, তেমনই অংশীজনদেরও কোনো তাড়া আছে বলে মনে হয় না।
সরকারি চাকুরে সাংবাদিকদের কেউ কেউ অবশ্য শুধু একটা নতুন ওয়েজ বোর্ডেই সমস্যার সমাধান দেখেছেন, যেটা এই শিল্পে তেমন একটা মানা হয় না। বরং, কাগজে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের প্রত্যয়নপত্রে সই নিয়ে এবং ব্যাংকে বেতন পাঠিয়ে নগদে তার একটা অংশ ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়। এই প্রতারণাকে বহু বছর ধরে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, যাতে পরিস্থিতির বরং অবনতি ঘটেছে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সুরক্ষা ও সাংবাদিকদের অর্থিক দৈন্য ঘোচানোর অন্য কোনো বিকল্প নেই।
বিভুদার জন্য শোক ও তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। তারিখ ইব্রাহিম পরিচয়ে তার রাজনৈতিক লেখার কথা তো ভোলা যায় না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।
খবরটি শেয়ার করুন