রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

সুখবর এক্সপ্লেইনার

নিলোফার মনির বক্তব্য ঘিরে রাজনীতির পুরোনো প্রশ্নের নতুন প্রত্যাবর্তন

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৫:৪৮ অপরাহ্ন, ৩রা জুলাই ২০২৬

#

ফাইল ছবি

রাজনীতিতে একটি পরিচিত দৃশ্য আছে। কোনো নেতা বা জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যে এমন একটি মন্তব্য করলেন, যা মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হলো সমালোচনার ঝড়। দলের ভেতর থেকেও এলো অস্বস্তির ইঙ্গিত। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি বিবৃতি—‘আমার বক্তব্য প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে’, ‘কাটছাঁট করে প্রচার করা হয়েছে’, বা ‘আমি যা বলতে চেয়েছি, সেটি গণমাধ্যম সঠিকভাবে উপস্থাপন করেনি।’

দেশের রাজনীতিতে এমন দৃশ্য নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনো সময়ে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কখনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে, আবার কখনো পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রকাশের পর দেখা গেছে, বিতর্কের জন্ম দেওয়া কথাগুলো আসলেই বক্তার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল। ফলে প্রতিবারই নতুন করে সামনে আসে একই প্রশ্ন—সমস্যা কি বক্তব্যে, নাকি বক্তব্য উপস্থাপনের পদ্ধতিতে?

এবার সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি। দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান নিয়ে দেওয়া তার কয়েকটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুটি বক্তব্য সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। একটি, ‘এই আন্দোলনে কারা যে মেইন (প্রধান) ছিল তা কেউ জানে না।’ অন্যটি, উপস্থাপকের প্রশ্নের জবাবে বলা—‘ডিজাইন তো অবশ্যই ছিল, তবে ষড়যন্ত্র ছিল কিনা তা জানি না।’

প্রচারিত ভিডিওতে নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘এই আন্দোলনে কারা যে মেইন (প্রধান) ছিল তা কেউ জানে না। একজন আরেকজনকে চেনে না। পাশে হাঁটতে গেছে, আন্দোলনে গেছে, পাশের আরেকজন পড়ে গেছে, মনে করছে যে সে নরমাল পড়েছে, আসলে সে মারা গেছে। গুলিটা সামনে থেকে আসছে না পেছন থেকে আসছে, সেটাও জানে না। গুলির কোনো শব্দ হয় নাই। স্নাইপারের গুলি ছিল, অনেকেই যারা পড়ে গেছে।’

এরপর উপস্থাপক জানতে চান, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন কি ‘ডিজাইন’ ছিল, নাকি কোনো ষড়যন্ত্র? জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিজাইন তো অবশ্যই ছিল তবে ষড়যন্ত্র ছিল কিনা তা জানি না। এটাও সত্যি, শুধু যারা আন্দোলনে ছিল (আন্দোলন) যে কেবল তাদের হাতেই ছিল তা কিন্তু না। অনেক কিছু না জেনে তারা আবেগে এসেছিল, অন্যায়ের প্রতিবাদে এসেছিল। তারা একজন আরেকজনকে চিনে না।’

আলোচনার শেষদিকে তিনি আরও বলেন, ‘আমার নিজের কাছে অনেক প্রশ্নের উত্তর নাই। আমি যেহেতু দুইটা কথা বলি। অনেক কিছু আমি স্টাডি করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু একটা জায়গায় যেয়ে আর কোনো উত্তর নাই।’

টেলিভিশনে প্রচারের কিছুক্ষণের মধ্যেই বক্তব্যের এই অংশগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল এবং ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ শেয়ার হতে থাকে। কোথাও পুরো বক্তব্য, কোথাও মাত্র ২০ বা ৩০ সেকেন্ডের অংশ। এরপরই শুরু হয় বিতর্ক। বিতর্ক আরও গভীর হয় যখন সমালোচনা আসে বিএনপির নিজের রাজনৈতিক বলয় থেকেই।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নিলোফার চৌধুরী মনিকে উদ্দেশ করে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। ভাষা ছিল সমালোচনামূলক, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক নয়। তিনি লেখেন, নিলোফার চৌধুরী মনি দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের একজন সক্রিয় সহযাত্রী এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে তারা ‘অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ’ হয়েছেন।

একই রাজনৈতিক পরিবারের ভেতর থেকে এমন প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া খুব ঘন ঘন দেখা যায় না। ফলে বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করে, ছাত্রদলের এই অবস্থান শুধু ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নয়; বরং জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানকে ঘিরে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তির সুযোগ না রাখারও একটি প্রচেষ্টা।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের তীব্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। একের পর এক পোস্ট, ভিডিও বিশ্লেষণ, লাইভ আলোচনা এবং মন্তব্যে ভরে যায় ফেসবুকের টাইমলাইন। কেউ নিলোফার মনির বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন, কেউ আবার অপেক্ষা করতে বলেন পুরো বক্তব্য বা তার ব্যাখ্যার জন্য। ঠিক  তখনই আসে নতুন মোড়। সমালোচনার মুখে নিলোফার চৌধুরী মনি নিজেই গণমাধ্যমের সামনে এসে দাবি করেন, তার বক্তব্যের অর্থ বদলে গেছে, কারণ সেটি ‘কাটছাঁট করে’ প্রচার করা হয়েছে।

তার এই দাবি শুধু চলমান বিতর্কের গতিপথই বদলে দেয়নি; বরং দেশের রাজনীতিতে বহুবার ফিরে আসা আরেকটি পুরোনো বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—বিতর্কিত মন্তব্যের দায় কি সব সময় বক্তার, নাকি কখনো কখনো বক্তব্যের উপস্থাপনাও বিতর্কের জন্ম দেয়?

সমালোচনার ঝড় শুরু হওয়ার পর খুব বেশি সময় নেননি নিলোফার চৌধুরী মনি। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তার দাবি, যে বক্তব্য নিয়ে এত বিতর্ক, সেটি তিনি যে অর্থে বলেছিলেন, সেই অর্থে প্রচার করা হয়নি। বরং বক্তব্যের কিছু অংশ আলাদা করে প্রচার করায় ভিন্ন অর্থ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমার বক্তব্য অবশ্যই কাটছাঁট করে প্রচার করা হচ্ছে। আমি কালকে বেশ কয়েকটি টকশো করেছি। আমি জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষের মানুষ। আন্দোলনের সময়ও টকশো করেছি। আমি বলেছি, পুলিশের কাছে স্নাইপার ছিল না। তাহলে এসব অস্ত্র কোথা থেকে এলো, সেটার তদন্ত হওয়া উচিত।’

সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ‘ডিজাইন’ শব্দটির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি “জুলাই ডিজাইন” বলেছি এই অর্থে যে, ষড়যন্ত্র করে আমাদের ছেলেগুলোকে হত্যা করা হয়েছে। আমি তো বলিনি, জুলাই আন্দোলন ডিজাইন করা হয়েছিল। আমার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, আমাদের ছেলেদের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পনা বা ডিজাইন করা হয়েছিল।’

এই ব্যাখ্যার পর বিতর্ক থেমে যায়নি। বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে যায়। শুরু হয় নতুন প্রশ্ন—আসলেই কি বক্তব্য কাটছাঁট করে এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল, যাতে তার বক্তব্যের অর্থ বদলে যায়? নাকি প্রচারিত অংশই তার বক্তব্যের মূল বার্তা বহন করছিল? সামাজিক মাধ্যমে এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর দেখা যায়নি। বরং মতামত স্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

ফেসবুকে আরিফ হাসান লিখেছেন, ‘যদি বক্তব্য সত্যিই কাটছাঁট করা হয়ে থাকে, তাহলে পুরো ভিডিও সামনে আনা হোক। জনগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে।’ সাদিয়া তাসনিমের মন্তব্য, ‘আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পুরো বিতর্কের ভিত্তি হয়ে যায়। তাই পুরো সাক্ষাৎকার না দেখে চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক নয়।’

তবে ভিন্ন মতও ছিল। মাহমুদুল করিম লিখেছেন, ‘একজন সংসদ সদস্যের প্রতিটি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ। পরে ব্যাখ্যা দিয়ে যদি বক্তব্যের অর্থ পাল্টাতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে বক্তব্যটি যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না।’ রুবাইয়াৎ রহমানের মন্তব্য ছিল আরও সরাসরি। ‘বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, বক্তব্য বিতর্কিত হলেই বলা হয়—গণমাধ্যম বিকৃত করেছে। কিন্তু পুরো ভিডিও প্রকাশ হলে অনেক সময় দেখা যায়, মূল কথাগুলো ঠিকই বলা হয়েছিল।’

এই প্রতিক্রিয়াগুলো বাস্তবের একটি প্রবণতাকেই সামনে আনে। সামাজিক মাধ্যমে এখন কোনো বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণের চেয়ে ছোট ভিডিও ক্লিপ অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে কয়েকটি বাক্য, পুরো বক্তব্য নয়। একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সংবাদ প্রতিবেদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্যের নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে প্রচার করা হলে তার প্রেক্ষাপট হারিয়ে যেতে পারে।

যোগাযোগবিদেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, একটি বক্তব্যের অর্থ অনেক সময় নির্ভর করে তার আগের ও পরের বাক্য, প্রশ্নের ধরন, আলোচনার পরিবেশ এবং বক্তার উদ্দেশ্যের ওপর। সেই প্রেক্ষাপট বাদ গেলে একই বাক্য ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে। কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা আরও জটিল।

রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, কোনো বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা তৈরি হওয়ার পর বক্তা দাবি করেছেন, তার বক্তব্য প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, সম্পাদনা করে প্রচার করা হয়েছে অথবা গণমাধ্যম তার বক্তব্যের সঠিক অর্থ তুলে ধরেনি। আবার এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে পূর্ণাঙ্গ ভিডিও প্রকাশের পর প্রমাণ মিলেছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছোট ক্লিপটি পুরো বক্তব্যেরই প্রতিনিধিত্ব করছিল। অর্থাৎ প্রতিটি ঘটনাকে একই মানদণ্ডে বিচার করা কঠিন।

নিলোফার চৌধুরী মনি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250