মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ‘নতুন দেশ’, ন্যাটোকে চ্যালেঞ্জ করা কে এই ‘সুলতান’ *** গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি *** ‘লন্ডনে তারেক রহমানকে ট্রফি দিয়ে ভোটের তারিখ নিয়ে আসেন ড. ইউনূস’ *** আগামী মাসে তেলের দাম বাড়ানোর চিন্তা করবে সরকার: জ্বালানিমন্ত্রী *** বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে ছিলেন শিরীন শারমিন, লালবাগের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে: ডিবি *** নির্মূলের লক্ষ্যের বছরেই হামের প্রাদুর্ভাব *** সরকারি দলের সংসদীয় সভা বিকেলে *** অসংক্রামক রোগে মৃত্যু বেশি, থেমে নেই সংক্রামক রোগও *** দেশে হঠাৎ কেন হামের প্রাদুর্ভাব *** পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফরে যাচ্ছেন আজ

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ

নির্মূলের লক্ষ্যের বছরেই হামের প্রাদুর্ভাব

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০১:২৭ অপরাহ্ন, ৭ই এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

“স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ”—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হচ্ছে দেশে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে দিবসটিতে দেশের জনস্বাস্থ্য বাস্তবতায় এক ধরনের অস্বস্তিকর বৈপরীত্য সামনে এসেছে। যে বছরে হাম ও রুবেলা নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেই বছরেই দেশ হামের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত।

২০১৮ সালে দেশ রুবেলা নিয়ন্ত্রণে সফলতা পেয়েছিল এবং চলতি বছর হাম ও রুবেলা নির্মূল করার কথা ছিল। কিন্তু এখন স্বাস্থ্য খাত হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। শত শত শিশু বর্তমানে হাম ও এর জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে, আর কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১১৮টি সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। এর মধ্যে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৫টি মৃত্যু হয়েছে। একই সময়সীমায় সারাদেশে অন্তত ৮ হাজার ৫৩৪ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৮২টি। গতকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ৬ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন—তাদের বেশিরভাগই শিশু।

তবে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত ২০টি হামজনিত মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯৯টি রোগী নিশ্চিত করতে পেরেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা ঢাকার রেফারেন্স ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়, যা সময়সাপেক্ষ। ফলে প্রথমে রোগীদের সন্দেহভাজন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়, পরে পরীক্ষায় নিশ্চিত হলে তথ্য হালনাগাদ করা হয়।

এ ছাড়া হাম রোগের প্রধান লক্ষণ—জ্বর ও ফুসকুড়ি—অন্যান্য অনেক রোগেও দেখা যায়। তাই সব সন্দেহভাজন রোগী শেষ পর্যন্ত হাম হিসেবে নিশ্চিত হয় না, যা দুই ধরনের তথ্যের পার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। গত রোববার ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যেখানে সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। কর্মসূচির প্রথম দিনেই ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী ৭৬ হাজার ১২৩ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমস্যার মূল জায়গাটি আরও গভীরে। তাদের মতে, গত কয়েক দশকে টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য থাকলেও সাম্প্রতিক টিকাদানের ঘাটতির কারণে অনেক শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে নেওয়া জরুরি পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে তেমন কার্যকর হবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক বেনজির আহমেদ সুখবর ডটকমকে বলেন, দেশের টিকাদান কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, “সেই অবস্থান থেকে এখন আমরা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখছি, যেখানে শত শত শিশু হাসপাতালে জীবনের সঙ্গে লড়াই করছে।”

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া খাতভিত্তিক কর্মসূচি বাতিল করায় টিকার সংকট তৈরি হয়, যা অনেক শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়েছে। “বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে যখন আমাদের ইতিবাচক কিছু উদযাপন করার কথা, তখন আমাদের একটি প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ২০২৬ সালের মধ্যে হাম-রুবেলা নির্মূলের কথা থাকলেও আমরা এখন হাসপাতালে বাড়তে থাকা রোগীর সংখ্যা নিয়ে লড়াই করছি,” বলেন তিনি।

টিকাদান পরিস্থিতির চিত্রও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৩ সালের সর্বশেষ ইপিআই কভারেজ মূল্যায়ন জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট টিকাদানের হার ছিল ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে পূর্ণ বৈধ টিকাদানের হার ছিল ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ নির্ধারিত সব টিকার সব ডোজ গ্রহণের হার তুলনামূলক কম।

ইপিআইয়ের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় কভারেজ কমেছে। বিশেষ করে হাম-রুবেলা টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস বয়সী শিশুদের এমআর-১ এবং ১৫ মাসের বেশি বয়সীদের এমআর-২ টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে এই দুই ডোজের কভারেজ কমছে।

যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যায়, তাদের আওতায় আনতে প্রতি চার বছর পরপর বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হয়। সর্বশেষ এমন কর্মসূচি হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে নির্ধারিত বিশেষ ক্যাম্পেইনটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে করা সম্ভব হয়নি। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারও এ ধরনের কোনো কর্মসূচি নেয়নি।

এ ছাড়া ২০২৫ সালে তিন দফা ধর্মঘটে যান স্বাস্থ্য সহকারীরা, যারা শিশুদের টিকা দিয়ে থাকেন। এতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থসংকটের কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কিছু এলাকায় টিকা রেশনিং করতে হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন সুখবর ডটকমকে বলেন, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ায় সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “শুধু জরুরি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সংস্কার আনা জরুরি, যাতে টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়।”

তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন স্থায়ী স্বাস্থ্য কমিশন গঠন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য আলাদা অধিদপ্তর তৈরিসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সরকার এখনো সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে হাম অত্যন্ত দ্রুত ছড়াতে পারে। টিকাদানের কভারেজে সামান্য ঘাটতিও বড় প্রাদুর্ভাবে রূপ নিতে পারে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে যখন স্বাস্থ্য খাতের অর্জন তুলে ধরার কথা, তখন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শত শত শিশুর জীবনসংগ্রাম যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প বলছে। নির্মূলের লক্ষ্য সামনে রেখেও প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়াই—এই বৈপরীত্যই এখন দেশের জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250