রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

হরিদাস চন্দ্রের গ্রেপ্তার: দুই দেশের গণমাধ্যমে দুই রকম উপস্থাপনা

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৯:১৯ অপরাহ্ন, ১৩ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরের সভাপতি হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে সিআইডির গ্রেপ্তারের ঘটনা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি প্রতিবেশী ভারতের কিছু গণমাধ্যমেও তা আলোচনায় এসেছে। তবে দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটির উপস্থাপনা, তথ্যের অগ্রাধিকার এবং ভাষ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে।

অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসের বিরুদ্ধে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পাচার, সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন এবং অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা রয়েছে। তদন্তে পাঁচটি ব্যাংক হিসাব ও চারটি মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থের উৎস গোপনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। পরে তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হয়।

ডেইলি স্টার শিরোনাম করেছে—‘গাইবান্ধা টেম্পল প্রেসিডেন্ট অ্যারেস্টেড ইন টিকে ৯.৩৫ কোটি মানি লন্ডারিং কেস’। প্রতিবেদনে অভিযোগের আর্থিক দিক, সিআইডির তদন্ত এবং অর্থপাচারের কৌশলকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলমান এবং অভিযোগ আদালতে প্রমাণ হয়নি।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) ভিন্ন দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করেছে। তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে অর্থপাচারের অভিযোগের পাশাপাশি হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসের পূর্বপরিচয় তুলে ধরা হয়েছে—তিনি গাইবান্ধায় ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণ উদ্যোগের কারণে আলোচনায় এসেছিলেন। ফলে সংবাদটি শুধু একটি অপরাধসংক্রান্ত খবর নয়, বরং আগে আলোচিত একটি জনপরিচিত ব্যক্তির নতুন আইনি জটিলতা হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছে।

ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনের ভাষাও প্রায় একই ধরনের। তারা অর্থপাচারের অভিযোগের পাশাপাশি রামমূর্তি নির্মাণ উদ্যোগকে পরিচয়চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করেছে। এতে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক পাঠক বা ইংরেজি ভাষার পাঠকদের কাছে ব্যক্তিটিকে শনাক্ত করার জন্য পূর্বের আলোচিত ঘটনাকে সংবাদমূল্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিও একই ধরনের ফ্রেমিং অনুসরণ করেছে। তাদের শিরোনাম—‘বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রামমূর্তির উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার’। প্রতিবেদনের শুরুতেই তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এরপর সিআইডির অর্থপাচার, জালিয়াতি, সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন এবং তদন্তের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, এনডিটিভিও ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারণে রামমূর্তি নির্মাণ উদ্যোগকেই প্রধান ফ্রেম হিসেবে ব্যবহার করেছে; অভিযোগের বিষয়টি এসেছে পরবর্তী তথ্য হিসেবে।

অন্যদিকে ভারতের বাংলা দৈনিক এই সময়-এর প্রতিবেদনে ঘটনার ফ্রেমিং স্পষ্টভাবে ভিন্ন। শিরোনামেই বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি করতে চাওয়া হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস’। প্রতিবেদনে অর্থপাচারের অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও শুরু থেকেই জোর দেওয়া হয়েছে তার রামমূর্তি নির্মাণ উদ্যোগ এবং সেই উদ্যোগকে ঘিরে পূর্বের আলোচনার ওপর।

এই পার্থক্য সংবাদ উপস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে অপরাধ ও অর্থপাচার তদন্তের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। ফলে প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিআইডির মামলা, আর্থিক লেনদেন, তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে ভারতের যে সংবাদমাধ্যমগুলো ঘটনাটি প্রকাশ করেছে, সেখানে পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে রামমূর্তি নির্মাণের বিষয়টি। অর্থপাচারের অভিযোগ সেখানে মূল খবর হলেও সেটি অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্তরের তথ্য হিসেবে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ-ফ্রেমিং নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে, সংবাদমাধ্যম একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন দিককে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঠকের কাছে আলাদা বাস্তবতা নির্মাণ করে। একটি দেশের পাঠকের জন্য যে তথ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অন্য দেশের পাঠকের জন্য তা নাও হতে পারে। ফলে একই ঘটনার উপস্থাপনায় পার্থক্য তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

ভারতের গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও সাংবাদিক সেবান্তী নিনান বহু লেখায় উল্লেখ করেছেন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রতিবেশী দেশের খবর প্রকাশের সময় এমন উপাদানকে গুরুত্ব দেয়, যা ভারতের পাঠকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বা পরিচিত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অপরাধের চেয়ে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতীকসম্পর্কিত বিষয় অনেক সময় বেশি সংবাদমূল্য পায়।

গণমাধ্যম গবেষকদের মতে, এটি ‘ফ্রেমিং’-এর একটি প্রচলিত উদাহরণ। একই ঘটনার সব তথ্য সংবাদে থাকে না; সম্পাদকীয় বিবেচনায় কিছু তথ্য সামনে আসে, কিছু তথ্য পেছনে থাকে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে যেখানে ‘অর্থপাচার’ মূল শব্দ, ভারতের প্রতিবেদনে সেখানে ‘রামমূর্তি’ পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

তবে দুই দেশের প্রতিবেদনের একটি মিলও রয়েছে। কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই এখন পর্যন্ত হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে দোষী হিসেবে ঘোষণা করেনি। সবাই সিআইডির অভিযোগ, মামলা এবং আদালতের কার্যক্রমের তথ্য উল্লেখ করেছে। এটি সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি—অভিযোগ ও দণ্ডিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা।

গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত-অতিক্রমী সংবাদে জাতীয় প্রেক্ষাপটের প্রভাব খুবই শক্তিশালী। বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এটি অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধের খবর। ভারতের একটি অংশের পাঠকের কাছে এটি এমন একজন ব্যক্তির খবর, যিনি আগে একটি বড় রামমূর্তি নির্মাণ প্রকল্পের কারণে আলোচনায় এসেছিলেন। ফলে দুই দেশের সম্পাদকীয় অগ্রাধিকারে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবশ্য বিষয়টি আরও ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। কেউ এটিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ ব্যক্তির পূর্বপরিচয়কে সামনে এনে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষা ব্যবহার করেছে এবং তদন্তাধীন মামলার তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, সংবাদ কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়; তথ্য নির্বাচন, শিরোনাম, ভাষা এবং প্রেক্ষাপট—সব মিলিয়েই সংবাদ নির্মিত হয়। একই ব্যক্তি, একই অভিযোগ এবং একই দিনে প্রকাশিত সংবাদও ভিন্ন দেশে ভিন্ন পাঠ-অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম যেখানে আইনি প্রক্রিয়া ও আর্থিক অপরাধকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, ভারতের এনডিটিভি ও এই সময়-এর মতো সংবাদমাধ্যমে সেখানে পাঠকের পরিচিত প্রেক্ষাপট হিসেবে রামমূর্তি নির্মাণ উদ্যোগটি সামনে এসেছে। সংবাদ-ফ্রেমিংয়ের এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত দুই দেশের পাঠকের কাছে একই ঘটনাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে।

হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250