ছবি: সংগৃহীত
ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভবিষ্যতে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন এর আচরণ পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো কিংবা সাইবার হামলার মতো ঝুঁকি নয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এআই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এমন আশঙ্কার মধ্যেই আজ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় বসছেন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নেতারা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এবং হাগিং ফেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্লেমঁ দেলাঙ্গে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদকে এ বিষয়ে অবহিত করবেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা নিউইয়র্কে জড়ো হওয়ার সময়েই এই বৈঠক হচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্ব করছে ফ্রান্স। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারো। রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—এআইয়ের সক্ষমতা যদি মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায় এবং একই সঙ্গে এআই ব্যবস্থা নিজেই নিজের উন্নতি করতে শুরু করে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নিশ্চয়তা কী? বিষয়টি এখন আর কেবল প্রযুক্তিবিদদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পরিষদেও এটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাম অল্টম্যান নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সামনে এআইয়ের সক্ষমতা পরিমাপের জন্য অভিন্ন মানদণ্ড তৈরির প্রস্তাব দিতে পারেন। একই সঙ্গে এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত মডেল তৈরির সময় কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিচ্ছে, তা মূল্যায়নের একটি কাঠামো তৈরির কথাও তিনি বলবেন। অর্থাৎ শুধু নতুন প্রযুক্তি তৈরি করাই নয়, প্রযুক্তিটি কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং সেটিকে কতটা নিরাপদ রাখা যাচ্ছে—দুটি বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কারণে। জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল চলতি সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এআই এজেন্টের আচরণ এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেছে। প্রতিবেদনে মে থেকে জুলাই সময়কালে ওপেনএআই ও হাগিং ফেসের সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এআই এজেন্ট নেটওয়ার্কের বিধিনিষেধ পাশ কাটিয়েছে, আলাদা রাখার কথা থাকা ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ করেছে, মূল্যায়নকারীর পরীক্ষাকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব কাজের প্রতিটি ধাপ কোনো মানুষ সরাসরি নির্দেশ দেয়নি।
তবে জাতিসংঘের বৈজ্ঞানিক প্যানেলও এমন দাবি করেনি যে মানুষের নিয়ন্ত্রণ শিগগিরই নিশ্চিতভাবে হারিয়ে যাবে। বরং তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুল লক্ষ্য বা মানুষের উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্য অনুসরণকারী ব্যবস্থা আরও বেশি ফাঁক খুঁজে নিতে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ড গোপন করতে সক্ষম হতে পারে। এই ঝুঁকির সম্ভাবনা বা কখন তা ঘটতে পারে—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়ার মতো প্রমাণ এখনো নেই।
এ কারণেই এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রযুক্তি খাতের মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি সমন্বিতভাবে কমানোর আহ্বান জানান। তিনি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষকে এআই মডেল পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রস্তাব করেন। ওপেনএআইয়ের অল্টম্যানও এ ধরনের নিরাপত্তা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন শীর্ষ নেতা উন্নয়নের গতি কমানোর বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিরলভাবে একই অবস্থানে এসেছেন।
তবে এ নিয়ে প্রযুক্তি খাতের ভেতরে ঐকমত্য নেই। মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ সমন্বিতভাবে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তার বক্তব্য, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বিশেষভাবে এমন এআই তৈরির প্রতিযোগিতা নিয়ে সতর্ক করেছেন, যেখানে ব্যবস্থা নিজেই নিজেকে উন্নত করার দিকে এগিয়ে যায়।
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক অধ্যাপক সান্দ্রা ওয়াখটার মনে করেন, তাত্ত্বিকভাবে এআই উন্নয়নের গতি কমানো সম্ভব হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত কঠিন। তার মতে, এর জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয় প্রয়োজন, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বাস্তবায়ন করা কঠিন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবশ্য আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে আসছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি সতর্ক করে বলেন, এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্ব এমন কোনো প্রতিযোগিতায় যেতে পারে না, যেখানে নিরাপত্তার মান ক্রমেই নিচে নামতে থাকে। তার মতে, জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ প্রয়োজন হলেও এআইকে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখতে বৈশ্বিক সমন্বয় অপরিহার্য।
গুতেরেসের এই অবস্থান নতুন নয়। ১৮ জুলাই ২০২৩ সালে নিরাপত্তা পরিষদে এআই নিয়ে প্রথম বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পর্কে এর নির্মাতারাও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছিলেন, এআই যেমন জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতিও ঘটাতে পারে। বিশেষ করে বৈষম্য বাড়ানো, নজরদারি জোরদার করা এবং মানুষের ক্ষতি করার কাজে এআই ব্যবহারের আশঙ্কা তুলে ধরেছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বরও নিরাপত্তা পরিষদে এআই নিয়ে বৈঠক হয়। তখন গুতেরেস বলেছিলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই এআই মডেল আরও শক্তিশালী, বহুমুখী ও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এবং ভাষা, ছবি, শব্দ ও ভিডিওর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছু কাজও স্বয়ংক্রিয় করতে পারছে।
এবারের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা। এআই উন্নয়নে দুই দেশই কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে চাইছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার পর্যায়ে পৌঁছানো এআই-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পারস্পরিকভাবে তথ্য জানানোর ব্যবস্থার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
কিন্তু এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান এখনো দ্বিধাবিভক্ত। ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের ওপর বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে উৎসাহিত করবে। তার বক্তব্যের কেন্দ্রীয় যুক্তি ছিল, এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে।
এখানেই নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে এআই যত দ্রুত এগোচ্ছে, তত বেশি সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে একই প্রযুক্তি সাইবার হামলা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ভুয়া তথ্য এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে গবেষণা করা নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিবেদন নামের সংস্থার ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই সংঘাত প্রতিরোধ ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে; আবার এটি ক্ষতিকর সাইবার কর্মকাণ্ড, ব্যাপক ভুয়া তথ্য এবং ক্রমবর্ধমান স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
ফলে আজকের বৈঠককে কেবল প্রযুক্তি খাতের আরেকটি আলোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতে মানুষের হাতে নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে—এসব মৌলিক প্রশ্ন।
ইউরোপীয় এক কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেছেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে কি না, যেখানে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগকারী বিভিন্ন এআই ব্যবস্থা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধের সূচনা করে। এই প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু এআই ব্যবস্থা যখন মানুষের সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম হচ্ছে, তখন সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আগেভাগে আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—প্রযুক্তির উন্নয়ন বন্ধ না করেও কীভাবে নিরাপত্তার সীমা নির্ধারণ করা যায়। এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর, স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের কতটা ক্ষমতা দেওয়া হবে, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্ত হলে কে ব্যবস্থা নেবে এবং একটি দেশের এআই ব্যবস্থার কর্মকাণ্ড অন্য দেশের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করলে দায় কার—এসব প্রশ্নের উত্তর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো স্পষ্ট নয়।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আজকের বৈঠক সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই আরেকটি ধাপ। প্রযুক্তির গতি থামবে কি না, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে—এআই যত শক্তিশালী হবে, এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তত বেশি মানুষের হাতে থাকতে হবে। সেই নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিই এখন বিশ্বনেতা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
খবরটি শেয়ার করুন