শুক্রবার, ৬ই মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দুই ‘শিষ্যের’ সঙ্গে দুনীতির অভিযোগে সমালোচিত ‘গুরু’ আসিফ নজরুল *** স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া কে এই মাহেরীন চৌধুরী *** বৈধ সমিতির কল্যাণ তহবিল চাঁদাবাজি নয়: সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী *** প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সময় বিমানবন্দরে থাকবেন যারা *** দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে যা বলছেন ফারুক ওয়াসিফ *** ইরানের সব ড্রোন ঠেকানোর ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের না-ও থাকতে পারে: শীর্ষ মার্কিন সেনা কর্মকর্তা *** সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আনিস আলমগীরের জামিন *** নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রাজসাক্ষী সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা—দাবি জামায়াতের *** খালেদা জিয়াসহ এবার স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ ব্যক্তি ও ৫ প্রতিষ্ঠান *** দুই মাসে নেই দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র—তবু চীন কেন চুপ

স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া কে এই মাহেরীন চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১০:৪০ অপরাহ্ন, ৫ই মার্চ ২০২৬

#

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রয়াত শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী। ফাইল ছবি

সরকার এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করেছে। আজ বৃহস্পতিবার (৫ই মার্চ) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। পুরস্কার বিজয়ী সবাই চেনা মুখ। তাদের মধ্যে একজন মাহেরীন চৌধুরী।

শিক্ষার্থীদের প্রতি মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধের অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করে গেছেন রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই শিক্ষক। গত বছরের ২১শে জুলাই বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান মাইলস্টোন স্কুলে বিধ্বস্ত হয়। মাহেরীন চৌধুরী তখনো অক্ষত ও সুস্থ ছিলেন। কিন্তু বিপদের মুখেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নিজের সন্তানের মতো ছাত্রছাত্রীদের বাঁচাতে। বিনিময়ে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন।

ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ২১শে জুলাই দিবাগত রাতে মারা যান মাহেরীন চৌধুরী। তার শরীরের ১০০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকে।

মাহেরীন চৌধুরী নীলফামারীর জলঢাকার প্রয়াত মহিতুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তবে বাবার জন্মস্থানে তিনি বারবার গেছেন। এ সময় গ্রামের মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

জলঢাকা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বগুলাগাড়ী এলাকার রাজারহাট চৌধুরীপাড়ায় গত বছরের ২২শে জুলাই বিকেলে দাফন করা হয় মাহেরীন চৌধুরীকে। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তার স্বামী মনছুর হেলাল।

তিনি বলেন, ‘মাঝরাতে হাসপাতালের আইসিইউতে মাহেরীনের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। আমার হাত তার নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বলেছিল, “তোমার সাথে আর বুঝি দেখা হবে না।” ওই সময় আমি ওর হাতটা ধরতেই পারছিলাম না; কারণ, হাত দুটো খুব পুড়ে গিয়েছিল।’

কান্নায় গলা চেপে আসা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিহত শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরীর স্বামী। তিনি বলেন, ‘আমি ওকে আমাদের দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা তুললে মাহরীন বলেছিল, “ওরাও (শিক্ষার্থীরা) তো আমার সন্তান। ওদের রেখে চলে আসি কেমনে?” আমি সবকিছু দিয়ে আমার স্ত্রী মাহরীনকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছি, হেরে গেলাম। আমার ছোট ছোট বাচ্চা দুটি এতিম হয়ে গেল।’

মনছুর হেলাল জানান, ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাহেরীন যখন বের হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ সময় তিনি সামান্য আহত হন। কিন্তু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলেন, ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী ভেতরে আটকা পড়েছে। তাদের উদ্ধারে তিনি ভেতরে ঢোকেন এবং উদ্ধার করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

নিহত মাহেরীনের প্রতিবেশী আব্দুস সামাদ জানিয়েছিলেন, মাঝেমধ্যে গ্রামে আসতেন মাহেরীন। এ সময় এলাকার গরিব মানুষের খোঁজখবর নিতেন। সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা করতেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কালভার্ট নির্মাণেও সহযোগিতা করেছেন। এ কারণে মৃত্যুর দুই মাস আগে শিক্ষানুরাগী হিসেবে বগুলাগাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে তাকে মনোনীত করেছিল এলাকাবাসী।

নিহত মাহেরীন চৌধুরীর খালাতো ভাই সাংবাদিক রুমি চৌধুরী সে সময় জানিয়েছিলেন, মাহেরীনের বাবা মহিতুর রহমান চৌধুরী ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খালাত ভাই। জলঢাকার এ বাড়িতে জিয়াউর রহমান বেশ কয়েকবার এসেছিলেন।

মাহেরীন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে ফেসবুকে স্মৃতিচারণা করেছিলেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আলী আহমেদ মাবরুর। তিনি লিখেছিলেন, ‘মাহরীন আপা আমার মানারাতের সহপাঠী ছিলেন। আমরা একই সাথে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে মাস্টার্স করেছিলাম। বয়সে আমার একটু সিনিয়র হবেন। বনেদি ঘরের মানুষ, তবে একদম সাদামাটাভাবে চলাফেরা করতেন। আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তিনি উত্তরায় থাকতেন, সে হিসেবে আমার প্রতিবেশীও। উত্তরায় যখন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ ছিল, বেশির ভাগ অংশই যখন জলাভূমি ও গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ, তখন থেকে এই এলাকায় তাদের বসতি।’

গত কয়েক বছরের মধ্যে মা-বাবাকে হারান মাহেরীন চৌধুরী। সেই তথ্য তুলে ধরে মাবরুর লিখেছিলেন, ‘পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে সকল ভাই-বোন বরাবরই তাকে অভিভাবক হিসেবে গণ্য করতেন। তার দুই ছেলে। ওরাও বড় হয়ে গেছে।’

আলী আহমেদ মাবরুর আরও লিখেছিলেন, ‘মাহরীন আপা অনেক বছর যাবৎ মাইলস্টোন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাখায় তারা কাজে লাগিয়েছে। আপা এখন সিনিয়র টিচার। সেই হিসেবে বাড়তি কিছু দায়িত্বও ছিল তাঁর দিয়াবাড়ি শাখায়। গতকাল (২০২৫ সালের ২১শে জুলাই) যখন স্কুলের ওপর বিমানটি আছড়ে পড়ে, তিনি তার স্বভাবসুলভ মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। নিশ্চিত আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকে ২০ জনের বেশি ছাত্রছাত্রীকে তিনি সেভ করেছেন। কিন্তু এই সাহসী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে গিয়ে কখন নিজের জীবনকেই বিপন্ন করে ফেলেছেন, তা হয়তো তিনি বুঝতেও পারেননি। দুর্ঘটনার পরই তার সঙ্গে পরিবারের সবার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মধ্যরাতে তার লাশ যখন বাসায় আনা হয়, আমি দেখতে গিয়েছিলাম। তার স্বামী আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। বললেন, জানিস, তোর আপা পরশু রাতেও তোর কথা বলেছিল।’

মাহেরীন চৌধুরী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250