রবিবার, ৫ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** সোমবার ইরানের শেষ সুযোগ, মঙ্গলবার পাওয়ার প্ল্যান্ট গুঁড়িয়ে দেবেন ট্রাম্প *** সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আ.লীগের মন্ত্রীদের মতো উত্তর দিয়েছেন: বিএনপির এমপি মনিরুল *** সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩২ করে সংসদে বিল পাস *** ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় হামের বিশেষ টিকাদান *** ধর্ম পালন করায় মানসিক নিপীড়ন, মেডিকেল শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য *** ‘গয়েশ্বর রায়ের কাছে ব্যক্তিত্বের মূল্য মন্ত্রণালয়ের চেয়েও বড়’ *** এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন ও ছালেহ শিবলী *** ‘নরক’ নামানোর হুমকি ট্রাম্পের, পালটা যে পরিণতির বার্তা দিল ইরান *** প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময়

সুখবর এক্সপ্লেইনার

এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল: জাতিসংঘের প্রতিবেদন

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৬:১৪ অপরাহ্ন, ৫ই এপ্রিল ২০২৬

#

চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল, কারণ একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আজ রোববার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে।

জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) উচ্চ প্রতিনিধির কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রস্তুত করা ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করলেও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়ে গেছে।

এর মধ্যে রয়েছে—বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা, জলবায়ু ঝুঁকি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতি

বাংলাদেশ চলতি বছরের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথে রয়েছে। বহু বছরের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতির ফল হিসেবে এই অর্জন আসছে। তবে জাতিসংঘের সবশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই উত্তরণকে মসৃণ ও টেকসই করতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তুতি ঘাটতি রয়ে গেছে।

জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার মূল্যায়নে যেমন ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে, তেমনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—সঠিক নীতি, সংস্কার এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

আজ প্রকাশিত জাতিসংঘের ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রস্তুতি নিয়ে একটি বাস্তবধর্মী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধির কার্যালয়ের (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) বিশেষজ্ঞ প্যানেল এই মূল্যায়ন প্রস্তুত করে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের তিনটি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করলেও সামনে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা যথাযথভাবে মোকাবিলা না করলে অর্জন টেকসই রাখা কঠিন হতে পারে।

প্রতিবেদনে যে ঝুঁকিগুলোর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাণিজ্য সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা। এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পেয়েছে। উত্তরণের পর এসব সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাবে, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত—যা দেশের রপ্তানির মূল চালিকাশক্তি—এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে পারে।

এ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব খাতের সীমাবদ্ধতা এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতাও বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো নিম্নমুখী, ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহে সরকারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, শাসনঘাটতি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে রাখে।

জলবায়ু ঝুঁকিও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব উন্নয়ন অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতি—অর্থাৎ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক—উত্তরণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার আবেদন করেছে। সরকারের যুক্তি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা বিবেচনায় কিছু অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।

এর আগে গত বছর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন মূল্যায়নের জন্য ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। সেই অনুরোধের ধারাবাহিকতায় এই ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ পরিচালিত হয়, যেখানে সরকারি-বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে বিস্তৃত পরামর্শ করা হয়েছে।

এই মূল্যায়ন প্রতিবেদনকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একটি সতর্কবার্তা, যা সময় থাকতেই প্রস্তুতি জোরদার করার সুযোগ এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ যে ইতোমধ্যে উত্তরণের শর্ত পূরণ করেছে, সেটিই বড় অর্জন। এখন প্রয়োজন অর্জনকে টেকসই করা।

নীতিনির্ধারকদের মতে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, আইটি সেবা, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখার কৌশল নিতে হবে।

রাজস্ব খাতে সংস্কারও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ এবং কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এতে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা সহজ হবে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে, সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, শুধু নীতি প্রণয়ন করলেই হবে না; তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এজন্য সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন কৌশল যেন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে না যায়, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন এবং নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থায়ন সংগ্রহ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

প্রতিবেদনটিতে ‘সমাজভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ বা অংশীজনভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া উত্তরণ প্রক্রিয়া সফল হবে না। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত জাতীয় পরামর্শ সভায় এই বিষয়টি উঠে আসে, যেখানে মন্ত্রী, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ ও সরকারি উপদেষ্টারা অংশ নেন।

ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের পরামর্শক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক ও ড্যানিয়েল গে এই সভায় প্রতিবেদনটির মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, উত্তরণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার জন্য ধারাবাহিক প্রস্তুতি ও অভিযোজন প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এর সঙ্গে নতুন দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে। জাতিসংঘের এই মূল্যায়ন প্রতিবেদন সেই চ্যালেঞ্জগুলোকেই সামনে এনেছে। তবে একই সঙ্গে এটি একটি সুযোগও তৈরি করেছে—সময় থাকতেই দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণের।

সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে বাংলাদেশ শুধু সফলভাবে উত্তরণই করবে না, বরং উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিজ অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে। এখন প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ—যাতে উত্তরণ হয় মসৃণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই।

এলডিসি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250