ছবি: সংগৃহীত
বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক মনে করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত ছয় দফা ছিল বাঙালির মুক্তির প্রথম সনদ এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম খসড়া সংবিধান। তার ভাষায়, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা মুক্তির প্রথম সনদ ও প্রথম খসড়া সংবিধান।”
তিনি বলেন, “সাতচল্লিশে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান যে প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রেখেছিল, তা ছিল মূলত সম্পদ লুণ্ঠনের একটি যন্ত্র। এই কাঠামোর বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রথম প্রতিবাদ ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল আমাদের মুক্তির প্রথম সনদ বা প্রথম খসড়া সংবিধান।”
সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় নিজের এই মূল্যায়ন তুলে ধরে শাহদীন মালিক বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর বিবর্তন বুঝতে হলে ছয় দফার রাজনৈতিক তাৎপর্য নতুন করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধান’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় শাহদীন মালিক সম্প্রতি এসব কথা বলেন। গত ২২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। সুখবর ডটকমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে বক্তৃতার বিষয়ে শাহদীন মালিক বিস্তারিত আলোচনা করেন।
শাহদীন মালিকের এই বক্তব্যগুলো নতুন করে বাংলাদেশের সংবিধান, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন নিয়ে চলমান বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। তার বিশ্লেষণে যেমন ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান রয়েছে, তেমনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদারের তাগিদও স্পষ্ট।
বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে শাহদীন মালিক বলেন, “১৯৭২ সালের সংবিধান নির্ভুল ছিল না। তার কোনো দোষ-ত্রুটি ছিল না, তা–ও নয়। কিন্তু বিগত ১৫ বছরের স্বৈরশাসন, জবাবদিহিহীনতা বা স্বেচ্ছাচারিতা—এটা সংবিধানের দোষ নয়। সংবিধানকে যারা বারবার অপব্যবহার করেছে, তাদের দোষ।”
তিনি আরও বলেন, “বিগত শাসনামলের স্বৈরশাসন, জবাবদিহিহীন সমাজ ব্যবস্থা ও স্বেচ্ছাচারিতা বাহাত্তরের সংবিধানের দোষ নয়। বাহাত্তরের সংবিধান তৈরির সময় এ নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এটি আমাদের সংবিধানের মূল শক্তি।”
শাহদীন মালিকের মতে, সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়াটিই ছিল গণতান্ত্রিক চর্চার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি বলেন, “সংবিধান প্রণয়নকারীরা প্রত্যেকেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও সংবিধান প্রণয়ন শেষে পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিলেন। যা সারাবিশ্বেই বিরলতম উদাহরণগুলোর একটি।”
বাহাত্তরের গণপরিষদের ভূমিকার প্রশংসা করে শাহদীন মালিক বলেন, “দেশে তখন যে পরিস্থিতি ছিল, তাতে চাইলে আরও দু-তিন বছর গণপরিষদ সংসদ হিসেবে কাজ করতে পারত। সেই পরিস্থিতি দেশে ছিল। কিন্তু তারা সেটা করেননি। গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করে চলে গেছে, নিজের মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি, এই উদাহরণ আর পাওয়া যাবে না বললেই চলে। সেই গণপরিষদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল।”
তিনি বলেন, “নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এক বছর ধরে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও ভালো-মন্দ যাচাইয়ের পর বাহাত্তরের সংবিধান হয়েছিল। গণপরিষদ সদস্যরা বহু দেশের সংবিধান থেকে উদাহরণ টেনেছেন। তখন তো গুগল ছিল না। আশ্চর্য লাগে যে তারা সেগুলো জেনেছিলেন কেমন করে? তখন দেশে অনেক সংকট। এত কিছুর মধ্যেও এসব আলাপ-আলোচনা কীভাবে কোথা থেকে তারা করলেন!”
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতায় সংবিধান প্রণয়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আমার কাছে আজও বিস্ময় লাগে তারা কি দুরবস্থার মধ্যেই না আমাদের সংবিধান প্রণয়ন করেছেন। বাহাত্তর সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কোনো ব্রিজ নেই, এক কোটি শরণার্থী তখন ভারত থেকে দেশে ফিরে আসছেন। দেশে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই। এতকিছুর মধ্যেও তারা দিনের পর দিন আলোচনার মাধ্যমে, যুক্তি-তর্ক-বিতর্ক ও মতামত উপস্থাপনের মাধ্যমে সংবিধান রচনা করেছেন। সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তারা কোনো তাড়াহুড়া করেননি।”
সংবিধানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও শাহদীন মালিক বলেন, “এক বছরব্যাপী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এ সংবিধান রচিত হয়েছিল। কোনো কিছুই নির্ভুল হয় না। বাহাত্তরের সংবিধানও নির্ভুল ছিল না। সেটি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু গত কয়েক বছরের স্বৈরশাসন, জবাবদিতিতাহীন সমাজ ব্যবস্থা ও স্বেচ্ছাচারিতা বাহাত্তরের সংবিধানের দোষ নয়। পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীনেরা বাহাত্তরের সংবিধানকে বারবার অপব্যবহার করেছেন।”
তিনি উল্লেখ করেন, “সংবিধানে ১৬-১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। দেশে আইনের শাসন না থাকার জন্য আইন দায়ী নয়, বরং যারা আইন প্রয়োগ করে তাদের অপপ্রয়োগই মূলত দায়ী।”
সংবিধানের মূল দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শাহদীন মালিক বলেন, “বাহাত্তরের সংবিধানের মূলমন্ত্র ছিল প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। উৎস নয়। সংবিধানে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সীমিত রাখার মাধ্যমেই জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “এখন আমি যখন সংবিধান পড়ি তখন ভাবি, তখন তো কোথাও ইন্টারনেট ছিল না। সার্চ ইঞ্জিন ছিল না। মাসের পর মাস তারা বিভিন্ন দেশের সংবিধান থেকে প্রাপ্ত প্রকৃষ্ট বিষয়গুলো জীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংবিধানে তুলে এনেছেন। তারপরও এ নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।”
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে শাহদীন মালিক বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ছিল দীর্ঘদিন ধরে জনগণের অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। স্বৈরশাসকের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এমনই হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের অধিকারহীনতা, বিশেষ করে গত ১৫ বছরে অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হতে, দুঃশাসন-কুশাসন এবং অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হতে হতে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে রুখে দাঁড়ানোই আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য।”
সরকারবিরোধী অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জুলাই-আগস্টে যে সরকারের বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়ালাম, সেই সরকারটার কোনো নৈতিক ও আইনগত বৈধতা ছিল না। তাকে উচ্ছেদ করা খুবই প্রয়োজন ছিল। সরাসরি সুবিধাভোগী এবং সরকারের বেতন নেওয়া আমলা-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর লোক ছিল না। স্বৈরশাসকদের এটাই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।”
আইনের শাসন নিয়ে প্রচলিত ধারণার সমালোচনা করে শাহদীন মালিক বলেন, “বিগত বছরগুলোতে দেশে আইনের শাসন না থাকার দোষ আমরা আইনকে দিচ্ছি। বলা হচ্ছে, আইনের শাসন না থাকার দোষ হলো আইনের। আইনের শাসন না থাকার দোষ কিন্তু আইনের নয়; আইনকে যারা অপপ্রয়োগ করে, দোষ তাদের।”
তিনি বলেন, “আমাদের বর্তমান আলোচনাটা আমার কাছে মনে হয় এভাবে আবর্তিত হচ্ছে যে দেশে আইনের শাসন ও জবাবদিহি না থাকার মূল দোষ আইনের। কিন্তু এটা কখনো আইনের দোষ নয়। যারা আইনটাকে ব্যবহার করে, অপপ্রয়োগ করে বা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, আমরা তাদের কথা ভুলে গিয়ে যদি আইনকে দোষ দিই, তাহলে বোধ হয় সুবিচার করা হবে না।”
ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে শাহদীন মালিক বলেন, “ইতিহাস হলো বর্তমান ও অতীতের মধ্যে এক চলমান আলোচনা। ইতিহাস একটা বিতর্কের বড় জায়গা। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে সময়ের সঙ্গে ইতিহাসের বিকৃতি যেন না ঘটে।”
সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংসদে আইন সম্পর্কে কোনো আলোচনাই হয় না। আইনটিতে কী লাভ-ক্ষতি, প্রয়োগ হলে তারা কীভাবে লাভবান হবে, সেই আলোচনায় জনগণের অংশগ্রহণ থাকে না।”
তিনি বলেন, “যেকোনো আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাভাবনা করে, কেন কী করা হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য কী—এগুলো দেখতে হবে। এই আলোচনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সংসদ হলো আইন প্রণয়নের জন্য আলাপ-আলোচনার জায়গা।”
বর্তমান সংসদের গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য, গত কয়েকটি সংসদে ৬০-৭০ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী। তারা বোধ হয় কখনো আইনও পড়েননি। ফলে আইন নিয়ে আলোচনাগুলো হয় না। এই আলোচনাগুলো হওয়া দেশে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পূর্বশর্ত।”
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে শাহদীন মালিক বলেন, “যদি আলোচনাটা এমন হয় যে এই সংসদের উচিত হবে সব অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে হুবহু ‘ইয়েস’ বলে দেওয়া, তাহলে সংসদের দরকার কী?”
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার প্রতি চার দিনে একটা করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। কীভাবে জারি করেছে? উপদেষ্টাসহ কয়েকজন মিলে একটা কক্ষে আলোচনা করেছেন। অধ্যাদেশের কারণ কী, পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি কী, এটা হলে ভালো-খারাপ কী হবে—এই আলোচনায় কেউই অংশীদার ছিলাম না।”
টিপ্পনী কেটে তিনি বলেন, “আমরা ধরে নিচ্ছি, অন্তর্বর্তী সরকার খুব ভালো কাজ করেছেন, অধ্যাদেশ সংশোধন নিয়ে এত সময় নষ্ট করা হচ্ছে কেন, সংসদ পাস করে দিচ্ছে না কেন?”
তিনি আরও বলেন, “সংবিধানে বলা আছে, সংসদের দুটি অধিবেশনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০ দিন বিরতি থাকতে পারে। কিন্তু আলোচনা শুনে মনে হচ্ছে, বিরতিটা ৬০ দিনের জায়গায় ১৮০ দিন করে দেওয়া উচিত। এই ছয় মাসে নির্বাহী বিভাগ বা সরকার অধ্যাদেশ করবে, সংসদ ছয় মাস পর তিন দিনের জন্য অধিবেশন করে বলবে পাস, পাস, পাস, পাস, পাস।”
খবরটি শেয়ার করুন