ফাইল ছবি
দেশের রাজনীতিতে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়, নাকি এর গভীরে রয়েছে রাজনৈতিক কৌশল, জনমত ও ক্ষমতার হিসাব?
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশকে আইন হিসেবে বহাল রেখে বিএনপি সরকার কার্যত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখল।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি কী—আইনের ধারাবাহিকতা, জনমতের চাপ, নাকি রাজনৈতিক সুবিধা? প্রশ্নগুলো এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে জনপরিসরেও আলোচিত। ২০২৫ সালের ১১ মে 'সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯' সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে পরদিনই এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
এই অধ্যাদেশে সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়—‘কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ও তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের’। বর্তমান বিএনপি সরকার সেই একই বিধানকে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে সংসদে পাস করে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ও গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হবে।
সরকারের বক্তব্য—এখানে নতুন কিছু যোগ করা হয়নি, বরং একটি বিদ্যমান অধ্যাদেশকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আড়ালে একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এই সিদ্ধান্তকে জনমতের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষায়, "বিএনপি বিলটি পাশ করে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছে এবং তার মতে, "আওয়ামী লীগকে যদি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তো দুনিয়ার সব স্বৈরশাসককেই সম্মান করতে হবে"।
তিনি আরও বলেন, "এখনো রক্তের দাগ শুকায়নি। এ মুহূর্ত পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের যে সিদ্ধান্ত ছিল সেটি বহাল রাখাই যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি। এখনি যদি আওয়ামী লীগ স্বাভাবিকভাবে থাকে, তাহলে তো দুনিয়ার সব নিষ্ঠুর স্বৈরশাসককেই সম্মানিত করতে হবে। এখানে তাদের বিরুদ্ধে মানুষের এখনো তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। সরকার সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
সরকারের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট—তারা এটিকে কেবল আইনগত নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।
তবে সব বিশ্লেষক এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ নজির তৈরি করেছে। তার বক্তব্য, "বিএনপির এমন পদক্ষেপ ভবিষ্যতেও একই কায়দায় দল বা দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করল"।
তিনি আরও বলেন, "একটা দলের নেতা কর্মী বা সাধারণ সদস্যরা অপরাধ করতে পারেন। তার বিচারও হতে পারে। কিন্তু তার জন্য দল বা দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বহাল রেখে বিএনপি সরকার ভবিষ্যতেও অনেক দল নিষিদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করল," তার এই মন্তব্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনে—ব্যক্তির অপরাধের দায় কি একটি রাজনৈতিক দলের ওপর বর্তায়?
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, এখানে বিএনপির দায় নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি বলেন, "এখানে বিএনপির দায় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ যারা জনগণের অধিকার হরণ করেছে, যাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে, তাদের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তটি বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে মনে করি না,"
এছাড়া তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরেন—"দলটি (আওয়ামী লীগ) এখন হয়ত নিষিদ্ধ থাকছে। হয়তো পরে কখনও পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতেও পারে"। অর্থাৎ, এটি স্থায়ী নয়, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতিনির্ভর একটি সিদ্ধান্ত—এমন ধারণাও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি লাভবান কে? অনেকেই মনে করেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি একটি ‘নির্ঝঞ্ঝাট’ রাজনৈতিক পরিবেশ পেয়েছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলে শক্তিশালী বিরোধী শক্তির অভাব তৈরি হয়—যা ক্ষমতাসীন দলের জন্য সুবিধাজনক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনমত। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগবিরোধী জনমত এখনো তীব্র। এই অবস্থায় দলটিকে রাজনৈতিক সুযোগ দিলে সেটি জনরোষের মুখে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য বিরোধী শক্তির অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগকে ছাড় দিলে তারা রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে পরিস্থিতি জটিল করতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের ঘটনা নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছিল, যার সমালোচনা একসময় বিএনপিও করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য একটি নৈতিক প্রশ্নও তৈরি করছে।
বিলটি পাসের সময় সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি—এমন অভিযোগও উঠেছে। বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান আলোচনার সুযোগ চাইলেও তা পাননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে অবশ্য স্পষ্ট—সরকার এটিকে একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের ফল হিসেবে দেখছে। তিনি বলেন, "বিলটি হলো একটি গণত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে আইন ছিল সেটা সংশোধনের জন্য। ওনারা (জামায়াত) ও এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটা আন্দোলন করেছিলেন। সে প্রেক্ষিতে মোটামুটি একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতে তাদের (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে।"
খবরটি শেয়ার করুন