ফাইল ছবি
শায়লা শবনম
দেশের রাজনীতিতে কখনও কখনও এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা কেবল একজন ব্যক্তি বা দলকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা সম্পর্কে বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে। সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতারকে ঘিরে চলমান বিতর্ক ঠিক তেমনই একটি ঘটনা। কারণ তিনি শুধু দেশের প্রথম নারী স্পিকারই নন; তিনি একজন আইনবিদ, শিক্ষাবিদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত সংসদীয় ব্যক্তিত্ব।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অদৃশ্য ছিলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচার ছিল, তিনি পলাতক। প্রায় দুই বছর পর গতকাল মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ভোরে হঠাৎ ধানমন্ডির নিজ বাসা থেকে কেন তাকে নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করা হলো?
এই প্রশ্নটি শুধু আইনের নয়—রাজনীতিরও। কেন এমন একজন সজ্জন, পরিশীলিত ও ইতিহাসে অনন্য ব্যক্তিত্বকে এভাবে লক্ষ্য করা হলো?
ফলে তাকে গ্রেফতারকে ঘিরে ইতোমধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে এ ঘটনায় সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। তাদের মতে, এটি কি ন্যায়বিচারের প্রয়াস, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আরেকটি অধ্যায়?
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবনপথ মূলত ধারাবাহিক মেধা ও অর্জনের ইতিহাস। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জনের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। এরপর ১৯৮৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় একই বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।
পরবর্তীতে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংবিধানিক আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
আইন পেশায় তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী ছিলেন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং টানা তিনটি সংসদে এই দায়িত্ব পালন করেন—যা এ দেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা প্রায় সবাই একটি বিষয়ে একমত—তিনি ছিলেন সংযত, পরিমিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে বিশ্বাসী একজন রাজনীতিবিদ। অনেক সংসদ প্রতিবেদকের মতে, স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি খুব কমই রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন। বিরোধী দল বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে প্রকাশ্যে কটূক্তি করতে তাকে খুব একটা দেখা যায়নি।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতারকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ঘটনাটির প্রেক্ষাপট ও সময় নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তাকে ঢাকার ধানমন্ডিতে স্বামীর বাসা থেকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন—যদি তিনি এতদিন সেখানেই অবস্থান করতেন, তাহলে এতদিন কেন তাকে গ্রেফতার করা হয়নি? আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
হঠাৎ করে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের ঘটনাটি অনেকের কাছে রহস্যজনক ও নাটকীয় মনে হয়েছে। ফলে এই ঘটনায় বিভিন্ন সাংবাদিক ও বিশ্লেষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলেও চলছে তীব্র সমালোচনা। কেউ এটিকে আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ বলছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে মনে করছেন।
সাংবাদিক নেতা কুদ্দুস আফ্রাদ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যদি তিনি বাসায় থাকেন, তাহলে এতদিন সেই তথ্য অজানা ছিল কেন? তিনি সত্যিই বাড়িতে থাকলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তারই সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। সেই সাংবিধানিক বিধান এড়ানোর দায় কার?’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর মনে করেন, অতীতের অন্যায়কে প্রতিশোধ দিয়ে নয়, বরং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত। তার ভাষায়, ‘শেখ হাসিনার সরকারের সময় যে প্রতিহিংসার রাজনীতি দেখা গেছে, নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে মানুষের প্রত্যাশা—তারা যেন ভিন্ন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা থাকে আরও সংযত, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ।’
সাংবাদিক ফারজানা হোসেন লিখেছেন, ‘যদি তিনি এতদিন বাসাতেই ছিলেন, তাহলে কেন হঠাৎ গ্রেফতার?’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ঝর্নামণি লিখেছেন, ‘একজন স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ, মেধাবী ব্যক্তিত্ব এবং পরিশীলিত মানুষ ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তার একমাত্র অপরাধ—তিনি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের রাজনীতির অংশ ছিলেন। তার গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানাই।’
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতার নিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী মহলেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন—আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, তাই অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়া স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতারকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তাকে ধানমন্ডির বাসা থেকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু ১৯ মাস ধরে কোথায় ছিলেন—সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। এর আগে ৫ আগস্টের পর তার সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকার তথ্যও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল।
একজন সাবেক স্পিকারকে গ্রেফতার করার ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমালোচনার অন্য দিকও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদে অনেক বিতর্কিত আইন পাস হয়েছে এবং সে সময় স্পিকার হিসেবে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারেননি।
সমালোচকদের মতে, ওই সময় সংসদে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে নানা বিতর্ক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া হলেও স্পিকার হিসেবে তিনি তা থামানোর উদ্যোগ নেননি। ফলে দীর্ঘ সময়ের ওই রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি পরোক্ষভাবে একটি বিতর্কিত শাসন ব্যবস্থার অংশ ছিলেন। তবে একই সঙ্গে অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করেন, সে সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন স্পিকারের পক্ষে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার আন্তর্জাতিক ভূমিকা। তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক সংসদীয় ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন। অনেকের মতে, এমন একজন ব্যক্তিত্বের গ্রেফতারের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। এটি যদি ন্যায়বিচারের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অংশ হয়, তবে তা অবশ্যই আইনের আলোকে প্রমাণিত হতে হবে। আর যদি এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
দেশের চলমান প্রেক্ষাপটে সাবেক এই স্পিকারকে গ্রেফতার শুধু একটি ব্যক্তির ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রের মর্যাদা, ন্যায় এবং শিষ্টাচারেরও পরীক্ষা। যদি দেশে নেতারা মনে করেন, প্রতিহিংসা রাজনীতির অংশ—জনগণ তা কখনো মেনে নেবে না। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতারকে ঘিরে বিতর্ক হয়তো আরও কিছুদিন চলবে। তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি। রাজনীতি কি প্রতিহিংসার পথেই চলবে, নাকি ন্যায়বিচার ও শিষ্টাচারের নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পাবে—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আচরণের ওপর।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন