ছবি: সংগৃহীত
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বরাতিয়া গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে নদী খননের মাটি ফেলে রাখার ঘটনায় সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত মাটি সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামতের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক দিন আগেও যেসব ঘর ধসে পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে ছিলেন, এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে জানা গেছে, ভদ্রা নদী খননকাজের সময় তোলা মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর দেয়াল ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। এতে একাধিক ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। কোথাও কোথাও রান্নাঘর ও শৌচাগারে যাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকটি ঘরের মেঝে ও ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সম্প্রতি এ–সংক্রান্ত ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের দেয়ালের প্রায় সমান উচ্চতায় মাটি ফেলা হয়েছে। কিছু ভিডিওতে বৃষ্টির কারণে মাটি সরে গিয়ে ঘরের ভিত্তি ঝুঁকির মুখে পড়ার দৃশ্যও দেখা যায়। এসব ভিডিও হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকেই। ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদুল হাসান নামে একজন মন্তব্য করেন, “গরিব মানুষের জন্য ঘর বানিয়ে আবার সেই ঘরই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হলো। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” আরেক ব্যবহারকারী সুমাইয়া রহমান লেখেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাদের নতুন করে আতঙ্কে ফেলা হয়েছে।” তানভীর ইমরান নামে আরেক নেটিজেনের ভাষ্য, “ভিডিও না ছড়ালে হয়তো সমস্যার সমাধানই হতো না।”
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ভূমিহীন ও বাস্তুচ্যুত ৪৮টি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য ২০২১ সালে বরাতিয়া গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়। কয়েক দিন আগে ভদ্রা নদী খননের সময় উত্তোলিত মাটি ঘরগুলোর পাশে ফেলা হয়। পরে বাসিন্দারা ঝুঁকির কথা জানিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ঊর্মি ধর মুঠোফোনে বলেন, মাটি ফেলার পর তারা চরম আতঙ্কে ছিলেন। বৃষ্টি হলে ঘর ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই পরিবারগুলো দিন কাটিয়েছে। এখন বেশির ভাগ মাটি সরিয়ে নেওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোও মেরামত করা হচ্ছে।
একই প্রকল্পের বাসিন্দা যমুনা বেগম বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম আবার হয়তো ঘর হারাতে হবে। এখন মাটি সরানো হয়েছে, তাই একটু স্বস্তি পাচ্ছি।”
পাউবোর যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ঘরগুলোর পাশে ফেলা মাটি ইতিমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর মেরামতকাজও শুরু হয়েছে। তিনি জানান, অন্তত ১৫টি ঘরে বিভিন্ন মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, সেগুলো সংস্কার করা হচ্ছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভদ্রা নদীর পানিপ্রবাহ উন্নত করতে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতায় নদী খননের কাজ চলছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড পাউবোর তত্ত্বাবধানে কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
এদিকে ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পাউবো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কীভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর এত কাছে মাটি ফেলা হলো এবং এতে কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, শুধু মাটি সরিয়ে নেওয়াই নয়, ভবিষ্যতে যেন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসার পরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন