ছবি: সংগৃহীত
জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য দলের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিবারই দলের নেতৃত্বের একাংশের বিরোধিতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’-এ এসব উদ্যোগ এবং দলের ভেতরের মতবিরোধের বিবরণ উঠে এসেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের লেখাতেও বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রাজ্জাকের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের সাফল্যের পর তিনি দলের ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে একটি বক্তব্য দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপকের সহযোগিতায় একটি খসড়া বিবৃতি তৈরি করা হয়। ওই বিবৃতিতে একক পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতের অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যার পাশাপাশি ১৯৭১ সালে দলের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল।
খসড়া বিবৃতিটি অনুমোদনের জন্য জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে উপস্থাপন করা হলে তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়। এতে দলের তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এটিএম আজহারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। পরে খসড়াটি চূড়ান্ত করার জন্য মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি ছোট কমিটি গঠন করা হয়।
আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই কমিটি অন্তত ছয়বার বৈঠক করে। একপর্যায়ে বিজয় দিবসের আগে সংবাদ সম্মেলন করে বিবৃতিটি প্রকাশের প্রাথমিক সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। রাজ্জাক লিখেছেন, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং একাত্তরের অধ্যায়টি একবারের জন্য শেষ করতে আগ্রহী ছিলেন।
তবে খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর মুজাহিদ রাজ্জাককে জানান, তার ধারণা হয়েছে নিজামী ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো একজন প্রবীণ নেতার পরামর্শে নিজামী মত পরিবর্তন করেছিলেন বলে মুজাহিদ ধারণা করেছিলেন। ওই প্রবীণ নেতার নাম মুজাহিদ জানাননি। পরে নিজামী বিষয়টি জামায়াতের ওয়ার্কিং কমিটিতে তোলার কথা বলেন। ফলে ২০০১ সালে উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্ষমা চাওয়ার ঘোষণা আর দেওয়া হয়নি।
২০০৫ সালের অক্টোবরে বিষয়টি জামায়াতের ওয়ার্কিং কমিটিতে তোলা হয়। সেখানে আবদুর রাজ্জাক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করা রাজনৈতিকভাবে ও নৈতিকভাবে সঠিক ছিল কি না, সেই প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তার প্রস্তাবটি ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় মৌখিক ভোটে নাকচ হয়ে যায়। এরপর ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে দলের ওয়ার্কিং কমিটি ও নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন বৈঠকে বিষয়টি একাধিকবার আলোচিত হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় ক্ষমা চাওয়ার বিরোধীদের কয়েকটি যুক্তিও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের একটি যুক্তি ছিল, জামায়াত পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং সেই অবস্থানে ভুল ছিল না। আরেকটি যুক্তি ছিল, ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা থেকে জামায়াতের ওই অবস্থান নেওয়া যৌক্তিক ছিল। কেউ কেউ মনে করতেন, জামায়াত ক্ষমা চাইলেও আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা তা গ্রহণ করবে না।
এর আগে ১৯৯৪ সালেও একবার বিষয়টি সামনে এসেছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বহাল রাখার পর তার বক্তব্য তৈরির জন্য একটি কমিটি কাজ করেছিল। সেখানে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রাজ্জাকের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, গোলাম আযম শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন, অতীতে তিনি কোনো ভুল করে থাকলে তাকে যেন ক্ষমা করা হয়। রাজ্জাক এটিকে জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভূমিকার বিষয়ে সরাসরি ক্ষমাপ্রার্থনা হিসেবে বিবেচনা করেননি।
২০১৬ সালেও জামায়াতের ভেতর থেকে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছর নতুন আমির নির্বাচিত হওয়ার পর দলটি আবার বিষয়টি আলোচনায় আনে। দলের সাধারণ সম্পাদক রাজ্জাককে একটি বক্তব্যের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেন। ওই বছরের ২১ নভেম্বর রাজ্জাক আমিরকে একটি চিঠি দেন এবং সঙ্গে ক্ষমাপ্রার্থনার খসড়া যুক্ত করেন। সেখানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং সামরিক অভিযানের বিরোধিতা না করার জন্য দুঃখপ্রকাশ ও বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল।
তবে ওই উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াতের সামনে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়। রাজ্জাকের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, দলের নির্বাহী কমিটি একপর্যায়ে ১৯৭১ সালের বিষয়টি মোকাবিলা, দল বিলুপ্ত করা এবং নতুন দল গঠনের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শুরার সদস্যদের মতামত নেওয়া হলে অধিকাংশ সদস্য দল বিলুপ্তির পক্ষে ছিলেন এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দলটির নির্বাহী কমিটি ক্ষমা চাওয়া ও দল বিলুপ্ত—দুই সিদ্ধান্ত থেকেই সরে আসে। এরপর ২০১৯ সালে রাজ্জাক জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন।
ডেভিড বার্গম্যান ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত লেখায় উল্লেখ করেন, রাজ্জাক জামায়াতের সঙ্গে ৩৩ বছরের সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে দলটির কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল ১৯৬৬ সালের ছয় দফার বিরোধিতা, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন এবং স্বাধীনতার পর দলের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়া। রাজ্জাক তার স্মৃতিকথায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ও ধর্ষণের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো সাফাই দেওয়া যায় না এবং জামায়াতের উচিত ছিল সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করা।
রাজ্জাক ২০১৯ সালে জামায়াত থেকে পদত্যাগের পর আমার বাংলাদেশ পার্টি গঠনে সহযোগিতা করেন এবং দলটির প্রধান উপদেষ্টা হন। ২০২৪ সালে তিনি ওই পদ থেকেও সরে দাঁড়ান। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি মারা যান।
তার মরণোত্তর স্মৃতিকথা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ প্রকাশ করে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয় গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ডে। অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান, অধ্যাপক আলী রীয়াজ, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ এবং ডেইলি স্টারের পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ অংশ নেন। রাজ্জাকের দুই ছেলেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ২০১৬ সালে রাজ্জাক যে বক্তব্যের খসড়া তৈরি করেছিলেন, সেটি তখন জামায়াত স্বাক্ষর করলে দলটির ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত। তিনি বলেন, রাজ্জাকের ওই উদ্যোগ তার রাজনৈতিক চিন্তা ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২৬ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের সময় জামায়াতের নাম ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রসঙ্গে আইনে যুক্ত হওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াত ওই তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। পরে সংসদে সংশোধনীটি পাসের সময় জামায়াতের সদস্যরা এর বিরুদ্ধে ভোট দেননি।
১৮ সেপ্টেম্বরের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ বলেন, রাজ্জাকের বইটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও জামায়াতের রাজনৈতিক চিন্তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বইটি পড়ার পর আলোচনা করার আহ্বান জানান। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ইসলামপন্থী রাজনীতি করতে হলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে হবে।
এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাজ্জাকের স্মৃতিকথার ভিত্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জামায়াতের আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনার চেষ্টা দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০০১ সালের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা বিষয়টি শেষ করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন।
ফলে আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, জামায়াতের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নেতাদের মধ্যে আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার নাম রয়েছে। তবে তাদের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও দলের শীর্ষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। ১৮ সেপ্টেম্বর বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের পর দেশের গণমাধ্যমে রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় বর্ণিত এই অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নতুন করে আলোচনায় আসে।
খবরটি শেয়ার করুন