ফাইল ছবি
ইতিহাসের ভয়াবহ অপরাধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে দায় স্বীকার করে, তার নানা উদাহরণ আছে বিশ্বে। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে নাৎসি দখলদারির শিকারদের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ট। ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির অপরাধের ইতিহাস স্মরণ ও দায়বোধ প্রকাশের প্রতীক হয়ে আছে।
পরে জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ারও পোল্যান্ডে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির অপরাধের জন্য লজ্জা ও দায়বোধ প্রকাশ করেন। একইভাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ২০১৬ সালের ১৮ মে দেশটির পার্লামেন্টে কোমাগাতা মারু ঘটনার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চান। ১৯১৪ সালে কোমাগাতা মারু নামের জাহাজে করে ব্রিটিশ ভারতের ৩৭৬ জন যাত্রী কানাডায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। তৎকালীন বৈষম্যমূলক অভিবাসন আইনের কারণে তাদের অধিকাংশকে কানাডায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। জাহাজটি ভারতে ফিরে গেলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত হন এবং অনেকে গ্রেপ্তার বা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউকি হাতোয়ামাও দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে জাপানের ঔপনিবেশিক শাসন ও যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের জন্য গভীর অনুশোচনা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন। ২০১৫ সালে সিউলের সেওদায়েমুন কারাগার পরিদর্শনের সময় তিনি মাথা নত করে নীরব প্রার্থনা করেন এবং জাপানের কর্মকাণ্ডের জন্য গভীর অনুশোচনা ও আন্তরিক ক্ষমার কথা বলেন।
এসব ঘটনায় ক্ষমা বা দায় স্বীকারের ভাষা ছিল নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং দলটির পক্ষ থেকে সেই ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা হয়েছে কি না—এই প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত বইকে ঘিরে।
২০২৫ সালের ৪ মে মারা যাওয়ার আগে আবদুর রাজ্জাক লিখে গেছেন ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ নামে একটি বই। বইটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। সেখানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাক জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে যে বক্তব্যের খসড়া তৈরি করেছিলেন, সেটি দল গ্রহণ করলে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত।
বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান এবং বই নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আবারও উঠে এসেছে, জামায়াতের ভেতরে একাত্তরের ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। আবদুর রাজ্জাক ২০০৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। ২০১৯ সালে দল থেকে পদত্যাগের সময়ও একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা না করাকে পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় সহযোগী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। ঐতিহাসিক দলিল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলার নথিতে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের মতো সহযোগী বাহিনীর কার্যক্রমের কথা এসেছে। জামায়াতের তৎকালীন নেতাদের একটি অংশ এসব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন বিচারিক নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৭১ সালে জামায়াতের পূর্ব পাকিস্তান শাখার আমির ছিলেন গোলাম আযম। ওই সময় তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেন। বিভিন্ন সভা ও বিবৃতিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং পাকিস্তানের পক্ষে জনমত গঠনের আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শান্তি কমিটির একটি সভায় তার দেওয়া বক্তব্যের কথাও পরবর্তী বিচারিক নথিতে এসেছে।
যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার’ জারি করা হয়। এর আওতায় পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা, হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন করা হয়। একই বছরের ৩০ নভেম্বর সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। তবে হত্যা, ধর্ষণ, হত্যাচেষ্টা ও অগ্নিসংযোগের মতো নির্দিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিরা সেই সাধারণ ক্ষমার আওতায় ছিলেন না।
এর আগে ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল গোলাম আযমসহ কয়েকজনের নাগরিকত্ব বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধকালীন সহযোগীদের বিচারপ্রক্রিয়াও থেমে যায়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার বাতিল করেন। ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর জামায়াতের রাজনীতিতে ফেরার পথ তৈরি হয়। ১৯৭৯ সালে দলটি আবার নিজ নামে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সমালোচনা করলেও রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে জোট করেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ কারণে জামায়াতের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার মতো রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়নি।
১৯৯১ সালে গোলাম আযমকে জামায়াতের আমির ঘোষণা করা হলে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। পরে ৭২টি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন মিলে বৃহত্তর সমন্বয় কমিটি গঠন করে।
১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতীকী গণআদালত বসানো হয়। সেখানে গোলাম আযমকে একাত্তরের বিভিন্ন অপরাধে প্রতীকীভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার এ আয়োজন ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। পরে জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। ১৯৯৪ সালে জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পরও মামলাটি চলতে থাকে এবং ১৯৯৬ সালে তা বাতিল হয়।
গোলাম আযমের নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ১৯৯৪ সালে তিনি নাগরিকত্ব ফিরে পান। ওই সময় ঢাকার বায়তুল মোকাররমে এক জনসভায় তার একটি বক্তব্যকে পরবর্তী সময়ে জামায়াতের ক্ষমাপ্রার্থনা বিতর্কে বারবার উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘নবী ছাড়া কে দোষী নয়, দোষ কমবেশি সবারই আছে। তাই যারা আমার কোনো কাজকে ভুল মনে করেছেন, দুঃখ পেয়েছেন, আমি তাদের সবার কাছে জানাচ্ছি। আপনাদের এই বেদনার সঙ্গে আমি শরীক, আমিও দুঃখিত।’
তবে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক তার বইয়ে লিখেছেন, ১৯৯৪ সালে গোলাম আযমের বক্তব্যকে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য সরাসরি ক্ষমাপ্রার্থনা বলা যায় না। তার স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ওই বক্তব্যের আগে একটি কমিটি গোলাম আযমের জন্য বক্তব্যের খসড়া তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। সেখানে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার প্রস্তাব ছিল। শেষ পর্যন্ত গোলাম আযমের বক্তব্যে সেই বিষয়টি সরাসরি আসেনি।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের সাফল্যের পর আবদুর রাজ্জাক আবার দলটির একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তার বই অনুযায়ী, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষকের সহযোগিতায় একটি খসড়া বক্তব্যও তৈরি করেছিলেন। সেখানে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব ছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতেও এ নিয়ে দলটির ভেতরে আলোচনা হয়েছে। ২০০৫ সালে একটি খসড়া ক্ষমাপ্রার্থনার বক্তব্য দলীয় পর্যায়ে আলোচিত হয় বলে আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। ২০১৬ সালে তাকে আবারও জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্যের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডন থেকে জামায়াতের তৎকালীন আমির মকবুল আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান আবদুর রাজ্জাক। তিনি লিখেছিলেন, প্রায় তিন দশক ধরে তিনি জামায়াতকে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি ও দলটির ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং পাকিস্তানকে সমর্থনের সিদ্ধান্তের জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তার প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলেও পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন তিনি।
পদত্যাগের পরও জামায়াতের পক্ষ থেকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনার সিদ্ধান্ত আসেনি। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দলটির নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, তারা ক্ষমা চাওয়ার দাবির সঙ্গে একমত নন।
তবে পরবর্তী সময়ে দলটির বক্তব্যে পরিবর্তিত ভাষা দেখা যায়। ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইছেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালসহ ওই সময়ের পর থেকে কারও কষ্ট বা ক্ষতি হয়ে থাকলে সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি ক্ষমা চান।
এই বক্তব্যে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য পৃথকভাবে দলীয় সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনার ভাষা ছিল না। বরং ১৯৪৭ সাল থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত জামায়াতের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলা হয়। এ কারণে একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য সরাসরি দায় স্বীকারের প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় আসে।
এদিকে আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে জামায়াতের ভেতরে ক্ষমাপ্রার্থনা নিয়ে দীর্ঘদিনের মতবিরোধের বিবরণ রয়েছে। জামায়াতের কয়েক নেতা বিভিন্ন সময়ে আনুষ্ঠানিক ও শর্তহীন ক্ষমাপ্রার্থনার পক্ষে চেষ্টা করেছিলেন। একাধিক খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দলটির প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার আপত্তির কারণে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হয়নি।
১৮ সেপ্টেম্বর বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাকের তৈরি করা বক্তব্যটি গ্রহণ করা হলে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজও বক্তব্য দেন।
আলী রীয়াজ বলেন, জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে শুধু ১৯৭১ নয়, জামায়াতের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সহযোগী শক্তির তালিকায় তৎকালীন জামায়াতের নাম থাকা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াত ওই তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিল। কিন্তু সংশোধনী পাসের সময় তারা এর বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি। আইনমন্ত্রী এটিকে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন।
জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। ২০১০ সালের পর ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়। এসব মামলায় হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্ত নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। কয়েকটি মামলায় আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী একাত্তরে দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি সরাসরি দলীয়ভাবে ক্ষমা চাননি। একাধিক বক্তব্যে জামায়াত লুটপাট ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিল—এমন অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছিলেন।
দলের ভেতরে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে মতবিরোধের আরেকটি প্রকাশ ঘটে ২০১৯ সালে আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। তার পদত্যাগপত্রে শুধু ক্ষমাপ্রার্থনা নয়, দলীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক আদর্শ সংস্কারের কথাও ছিল।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এ বিষয়ে বলছেন, একাত্তরের অপরাধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে স্বীকার করার পরিবর্তে অভিযুক্ত পক্ষের কেউ কেউ এসব ঘটনাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। তার মতে, জামায়াতকে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলছেন, বর্তমান জামায়াতের সদস্যরা একাত্তরের সরাসরি অপরাধে যুক্ত না থাকলেও তারা যদি সেই সময়ের রাজনীতি ও আদর্শকে প্রত্যাখ্যান না করেন, তাহলে সেই রাজনৈতিক দায়ের প্রশ্ন থেকে যায়।
আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুর পর প্রকাশিত বইটি সেই পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। তার বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, জামায়াতের ভেতরে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার প্রস্তাব একবার নয়, বিভিন্ন সময়ে উঠেছিল। খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে তা কার্যকর হয়নি। ২০২৫ সালে আমির শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে জামায়াতের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার বক্তব্য এলেও ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য পৃথক ও স্পষ্ট দলীয় আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনার প্রশ্নটি এখনো আলোচনার বিষয় হয়ে আছে।
এই ইতিহাসে ১৯৯৪ সালের গোলাম আযমের বক্তব্য, ২০০১ সালের পর আবদুর রাজ্জাকের উদ্যোগ, ২০০৫ সালের খসড়া, ২০১৬ সালের বক্তব্য এবং ২০১৯ সালের পদত্যাগ—প্রতিটি ঘটনা একই প্রশ্নকে সামনে এনেছে: একাত্তরে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দলটি কি আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করবে? আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর বই প্রকাশের পর সেই প্রশ্নই আবার রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন