ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান জন্মলগ্ন থেকেই নিজেকে মুসলিম বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র, ইসলামের রক্ষক, এমনকি “সত্যিকারের মুসলিম রাষ্ট্র” হিসেবে প্রচার করে এসেছে। রাষ্ট্রের নামের সঙ্গে ইসলাম, সংবিধানের ভাষায় ইসলাম, রাজনীতির মঞ্চে ইসলাম, পররাষ্ট্রনীতির বক্তৃতায় মুসলিম উম্মাহ—সবই আছে। শুধু একটি প্রশ্ন বারবার দরজায় কড়া নাড়ে: এই ইসলামি রাষ্ট্রের বন্দুক সবচেয়ে বেশি কাদের দিকে উঠেছে? কাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে দেশটির হাত?
কঠিন সত্য হলো, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর শিকার হয়েছে দেশটির অভ্যন্তরে ও আশপাশের দেশগুলোর মুসলমান জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান, বেলুচ মুসলমান, পশতুন এবং আফগান সীমান্তের মুসলিম জনগোষ্ঠী—এদের মধ্যে অন্যতম। তাই সমালোচকদের চোখে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের এমন এক রাষ্ট্র, যে মুসলিম পরিচয়ের প্রচারে যত উচ্চকণ্ঠ, মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় বা রাষ্ট্র-সম্পৃক্ত সহিংসতার অভিযোগেও ততটাই অস্বস্তিকরভাবে সক্রিয়। এটিকে শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা বললে কম বলা হয়; এটি নৈতিক ব্যর্থতাও বটে।
এই রক্তের সবচেয়ে বড় ইতিহাস ১৯৭১। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভোটে জিতেছিল, কিন্তু ক্ষমতা পায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক-রাজনৈতিক এলিট ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযান শুরু হয়। ঢাকা থেকে গ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাজার, ঘর থেকে শরণার্থী-পথ—সব জায়গায় নেমে আসে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা।
১৯৭১-এর নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্মৃতিতে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা প্রতিষ্ঠিত। হোলোকাস্ট মিউজিয়াম হিউস্টন প্রায় ৩০ লাখ নিহতের কথা উল্লেখ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ গণহত্যা ও ব্যাপক বেসামরিক হত্যার জন্ম দিয়েছিল।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তানেও এই একই রাষ্ট্র-চরিত্রের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি রয়েছে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সালের সামরিক অভিযানে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ হাজারের বেশি মুসলিম বেলুচকে হত্যা করা হয়েছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে। সংখ্যা যাই হোক, রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট: পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশকে বহু দশক ধরে নাগরিক অধিকার বা সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন হিসেবে নয়, নিরাপত্তা-সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে।
আজও বেলুচিস্তান শান্ত নয়। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা যেমন বাস্তব, তেমনি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগও গুরুতর। সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালে বেলুচিস্তানে সংঘাত-সংক্রান্ত ৭৭৪ জন নিহত হন।
আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের দায় আরও জটিল। পাকিস্তান বহু বছর আফগান রাজনীতিকে “কৌশলগত গভীরতা” হিসেবে দেখেছে। এই নীতির ছায়ায় আফগানিস্তান বারবার প্রক্সি যুদ্ধ, সীমান্ত-সংঘাত ও শরণার্থী সংকটের ভেতর পড়েছে। সাম্প্রতিক সীমান্ত-সহিংসতায় সেই পুরোনো নীতির নতুন রক্তক্ষরণ দেখা গেছে।
জাতিসংঘের আফগান বিষয়ক সংস্থা ইউনামার হিসাবে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত-সহিংসতায় ৪৭ জন নিহত ও ৪৫৬ জন আহত হন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ—মাত্র তিন মাসে—ইউনামা ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নিহত এবং ৩৯৭ জন আহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। অধিকাংশ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তানের সামরিক বিমান হামলায়। জুন ২০২৬-এ আবার পাকিস্তানি বিমান হামলায় ১৩ জন বেসামরিক নিহতের কথা ইউনামা নিশ্চিত করে; নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারীও ছিলেন।
পাকিস্তানে আহমদিয়া বা কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ঘটনা নয়; এর পেছনে রাষ্ট্রীয় আইন, রাজনৈতিক মদদ, ধর্মীয় উসকানি এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধন করে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৮৪ সালে জিয়াউল হকের আমলে দণ্ডবিধিতে ২৯৮-বি ও ২৯৮-সি ধারা যুক্ত হয়, যার ফলে আহমদিয়াদের নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেওয়া, উপাসনালয়কে মসজিদ বলা, আজান দেওয়া কিংবা ইসলামি পরিভাষা ব্যবহার করা অপরাধের ঝুঁকিতে পড়ে।
এই আইনি বৈষম্য সমাজে আহমদিয়াবিরোধী ঘৃণাকে আরও বৈধতা দেয়। ফলে তাদের বাড়ি, উপাসনালয়, কবরস্থান এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বারবার হামলার মুখে পড়ে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০১০ সালের ২৮ মে। লাহোরে দুটি আহমদিয়া উপাসনালয়ে সমন্বিত হামলায় ৯৪ জন নিহত হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই হামলার পর পাকিস্তান সরকারের ব্যর্থতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন ঠেকাতে অক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করে।
পরিস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বদলায়নি। ২০২৪ সালে পাঞ্জাবের মান্দি বাহাউদ্দিনে দুই আহমদিয়া নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০২৫ সালেও পাঞ্জাবে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য হত্যার ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসে। পাকিস্তানে আহমদিয়াদের সংকট শুধু ধর্মীয় মতভেদের প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার, আইনের বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার গভীর সংকট।
গত কয়েক সপ্তাহজুড়ে চলমান বিদ্রোহের আগুনে পুড়ছে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মির। সেখানে সপ্তাহজুড়ে এখন পর্যন্ত ২৪ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন।
গত ছয় দশকের হিসাবে, পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় বা রাষ্ট্র-সম্পৃক্ত সহিংসতার ইতিহাসে শুধু বাংলাদেশে সংগঠিত হত্যাকাণ্ড নয়; এর সঙ্গে বেলুচিস্তানের সামরিক অভিযান, জোরপূর্বক গুম, আফগান সীমান্তে বেসামরিক মৃত্যু, আহমদিয়াদের সংকট এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অভিযানের নথিও যুক্ত করলে দেখা যায়, এগুলো পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন ভুলের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ অসুখ।
তবে পাকিস্তানের জনগণ আর পাকিস্তানের সামরিক-রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। পাকিস্তানের ভেতরেই মায়েরা নিখোঁজ সন্তানের ছবি হাতে হাঁটছেন। সাংবাদিকেরা চাপের মধ্যেও লিখছেন। আইনজীবীরা আদালতে দাঁড়াচ্ছেন। ছাত্রেরা প্রশ্ন করছে। বেলুচ, পশতুন, সিন্ধি ও পাঞ্জাবি সাধারণ মানুষও এই রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন রোষানলের ভুক্তভোগী।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এখানেই: যে রাষ্ট্র মুসলিম পরিচয়কে নিজের নৈতিক পুঁজি করেছে, সেই রাষ্ট্রই আবার মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। যে রাষ্ট্র উম্মাহর কথা বলে, সে যদি নিজের নাগরিকের কণ্ঠ দমন করে, প্রতিবেশী মুসলমানের ঘরে আগুন দেয়, আর ইতিহাসের অপরাধ স্বীকার না করে, তবে তার ইসলামি পরিচয় শুধু রাষ্ট্রীয় স্লোগান হয়ে থাকে, নৈতিকতার আদর্শে নয়।
রাষ্ট্রের শক্তি বন্দুকে নয়, জবাবদিহিতে। পাকিস্তান যত দিন ১৯৭১-এর দায়, বেলুচিস্তানের ক্ষত, গুমের অন্ধকার ও আফগান সীমান্তের বেসামরিক মৃত্যুকে নিরাপত্তার ভাষায় ঢাকতে চাইবে, তত দিন তার মুসলিম-রাষ্ট্র পরিচয় নিজেকেই প্রশ্ন করবে। কারণ ধর্মের নাম নিয়ে রাষ্ট্র গড়া যায়; কিন্তু মানুষের রক্তের ওপর ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকে না।
লেখক: কলামিস্ট।
খবরটি শেয়ার করুন