সোমবার, ২৬শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী *** সৌদিতে ২ বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের ঘটনার তথ্য চেয়েছে সংসদীয় কমিটি *** বাংলাদেশে ফের বিদ্যুৎ পাঠানো শুরু করেছে নেপাল *** নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে বট, প্রতিপক্ষকে আক্রমণে এআই *** ‘স্নাইপার এর অভাব ছিল’—মন্তব্য করা সেই যুবক ৭ দিনের রিমান্ডে *** হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে মামলা করলেন আসিফ আকবর *** টঙ্গীতে শিশুকে যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকের জামিন নামঞ্জুর *** মাদকসংশ্লিষ্টতায় দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে জেলে পাঠানো হয়েছে: আইজিপি *** তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** ফের সোনার দামে বড় পতন, ভরিপ্রতি যত হলো

স্পিকারের বক্তব্য নিয়ে ভাবনা

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ১০:১৩ অপরাহ্ন, ২৪শে জুন ২০২৬

#

ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

শংকর মৈত্র

জাতীয় সংসদের স্পিকার বলেছেন, "কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদ অধিবেশনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সংসদ অধিবেশন সবচেয়ে গুরুত্ব পায়।" সংসদে মন্ত্রীদের গরহাজির নিয়ে ২৩ জুন বিরোধীদলীয় নেতার এক প্রশ্নের জবাবে স্পিকার এ কথা বলেন। স্পিকারের এ বক্তব্য নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তাহলে কি কম গুরুত্বপূর্ণ?

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সংসদ একটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। স্পিকারের বক্তব্য—“রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদ অধিবেশনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়”—নতুন করে একটি আলোচনা তৈরি করেছে। বক্তব্যটি একদিকে সংসদের মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নও তৈরি করে। বিষয়টি তাই আবেগ দিয়ে নয়, সাংবিধানিক ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা প্রয়োজন।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ শুধু আইন তৈরির জায়গা নয়, এটি জনগণের কণ্ঠস্বর প্রকাশের ক্ষেত্র। সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান প্রতিষ্ঠানও। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সামনে জবাব দিতে হয়। বাজেট, আইন, জাতীয় নীতি—সবকিছুর বৈধতা আসে সংসদের মাধ্যমে। এ কারণে সংসদের অধিবেশনকে অবহেলা করা মানে গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে দুর্বল করা।

স্পিকারের বক্তব্যের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো—মন্ত্রীদের প্রধান দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা নয়, সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। সংসদ অধিবেশন চলাকালে একজন মন্ত্রীর উপস্থিতি জনগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ। যদি মন্ত্রীরা নিয়মিত সংসদ এড়িয়ে যান এবং অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সংসদের কার্যকারিতা কমে যায়। প্রশ্নোত্তর পর্ব, আলোচনা, জরুরি বিষয় উত্থাপন—এসবের মাধ্যমে জনগণের সমস্যা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে উঠে আসে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগ এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সংসদ নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি করে। তাই সংসদ অধিবেশন চলার সময় মন্ত্রীদের উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি সাংবিধানিক সংস্কৃতির অংশ।

তবে স্পিকারের বক্তব্যের বিপক্ষেও যুক্তি রয়েছে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু সংসদীয় কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের সামনে এমন অনেক পরিস্থিতি আসতে পারে, যখন সংসদের বাইরের কোনো দায়িত্ব অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জাতীয় নিরাপত্তা সংকট, আন্তর্জাতিক জরুরি আলোচনা, বড় ধরনের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত বা আকস্মিক কোনো পরিস্থিতি।

ধরা যাক, দেশের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক চলছে, যেখানে একজন মন্ত্রীর উপস্থিতি প্রয়োজন। অথবা বড় কোনো দুর্যোগে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনও রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। তাই সব রাষ্ট্রীয় কাজকে সংসদের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলা বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় মেলে না।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের কোন প্রতিষ্ঠান কখন অগ্রাধিকার পাবে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো প্রতিষ্ঠানই একা সর্বোচ্চ নয়; বরং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। সংসদ আইন ও জবাবদিহির কেন্দ্র, সরকার প্রশাসন পরিচালনার কেন্দ্র, বিচার বিভাগ আইনের ব্যাখ্যার কেন্দ্র। রাষ্ট্র তখনই ভালোভাবে চলে, যখন এসব প্রতিষ্ঠান পরস্পরের দায়িত্বকে সম্মান করে।

স্পিকারের বক্তব্যকে যদি একটি নীতিগত সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর গুরুত্ব আছে। এর অর্থ হতে পারে—মন্ত্রীদের যেন সংসদকে অবহেলা না করেন, সংসদীয় দায়িত্বকে দ্বিতীয় সারির কাজ মনে না করেন। কিন্তু যদি বক্তব্যটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, সংসদের বাইরে কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের গুরুত্ব নেই, তাহলে সেটি বিতর্কের জন্ম দেবে।

গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না; সংসদীয় আচরণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা এবং দায়িত্বশীলতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকে। সংসদে উপস্থিত থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্রের জরুরি দায়িত্ব পালন করাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে সবচেয়ে প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, সংসদ রাষ্ট্রের হৃদপিণ্ডের মতো—এখান থেকে জনগণের মতামত ও জবাবদিহির রক্ত সারা ব্যবস্থায় প্রবাহিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের শরীরের অন্য অঙ্গগুলোর কাজও থেমে থাকতে পারে না। তাই সঠিক অবস্থান হতে পারে—সংসদ অধিবেশনকে অবহেলা করা যাবে না, আবার প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকেও ছোট করে দেখা যাবে না।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, এখানে ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব বড়। সংসদ ও রাষ্ট্রীয় কাজ—দুটিই জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হওয়ার কথা। প্রশ্ন হওয়া উচিত কোনটি বড় নয়; বরং কোন পরিস্থিতিতে কোন দায়িত্বকে কীভাবে সঠিকভাবে পালন করা যায়। বলা হয়, “সংসদ সার্বভৌম”—এই কথাটি নিয়েও মতভেদ রয়েছে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে সংসদের সার্বভৌমত্ব একটি প্রচলিত ধারণা। সেখানে বলা হয়, সংসদ সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান; সংসদ যে আইন পাস করে, তা আদালত বাতিল করতে পারে না (প্রথাগতভাবে)।

কিন্তু বাংলাদেশের মতো লিখিত সংবিধানভিত্তিক রাষ্ট্রে বিষয়টি আলাদা। দেশে সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এখানে সংবিধানই সর্বোচ্চ। সংসদ সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকে আইন প্রণয়ন করে। কোনো আইন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আদালত তা পর্যালোচনা করতে পারে। এমন নজির অনেক আছে। সংসদে পাস হওয়া অনেক আইন উচ্চ আদালত বাতিল বা সংশোধন করেছে।

এ দৃষ্টিতে বলা যায়, সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সংসদ সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ (বাংলাদেশের সংবিধানের ধারণা অনুযায়ী), সংসদ সেই ক্ষমতা প্রয়োগের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।

তাই বলা যায়, সংসদ শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সংসদকে “পরম সার্বভৌম” বলা সাংবিধানিকভাবে পুরোপুরি সঠিক নয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন ধারণাও সঠিক নয়।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট।

শংকর মৈত্র

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250