বুধবার, ২৮শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আমলাতন্ত্র জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের বুকে চেপে বসেছে, কিছুই করা যায় না: ফাওজুল কবির খান *** আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র *** ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণমাধ্যমকর্মীদেরই আদায় করতে হবে’ *** নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ‘সিম্প্যাথি’ পেতে মিথ্যা বলছেন: মির্জা আব্বাস *** ড্রোন বানাবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, সহায়তা করবে চীন *** নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইসির কাছে ৭১ সংগঠনের ১০ সুপারিশ *** ‘নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা গণভোটের পক্ষে–বিপক্ষে যাবেন না’ *** ‘কাজের টোপ’ দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে বাংলাদেশিদের পাঠানো হচ্ছে যুদ্ধে *** পায়ে পাড়া দিয়ে কেউ যদি আশা করে আমরা চুপ থাকব, তা হবে না: শফিকুর রহমান *** বিচ্ছেদের পর গলায় স্ত্রীর ছবি ঝুলিয়ে দুধ দিয়ে গোসল

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বছরের পর বছর ফোন হ্যাক করেছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

🕒 প্রকাশ: ০৬:৪০ অপরাহ্ন, ২৭শে জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

চীন বছরের পর বছর ধরে ডাউনিং স্ট্রিটের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন হ্যাক করেছে। এমনটাই উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই গুপ্তচরবৃত্তি অভিযানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেইজিংয়ের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হ্যাকারেরা ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ সহকারীর মোবাইল ফোন লক্ষ্যবস্তু করে বলে জানিয়েছে টেলিগ্রাফ। তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত ফোন এই হ্যাকের আওতায় পড়েছিল কি না—তা স্পষ্ট নয়। তবে এই ঘটনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র বলেছে, এটি ‘ডাউনিং স্ট্রিটের একেবারে কেন্দ্র পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল।’

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ‘সল্ট টাইফুন’ নামে পরিচিত এই চীনা গুপ্তচরবৃত্তি অভিযান এখনো চলমান। ফলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এতে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে। গত নভেম্বর এমআই ৫ চীনা রাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি নিয়ে পার্লামেন্টকে একটি ‘গুপ্তচর সতর্কতা’ জারি করেছিল।

এ সপ্তাহে কিয়ার স্টারমার চীন সফরে যাচ্ছেন। এটি ২০১৮ সালে থেরেসা মে–এর পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। এই সফরের লক্ষ্য বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা। এই সফরের আগে সরকার লন্ডনে একটি বিশাল চীনা দূতাবাস নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে। টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এই দূতাবাসটি লন্ডনের সবচেয়ে সংবেদনশীল কিছু যোগাযোগ কেবলের পাশেই স্থাপন করা হবে।

সমালোচকদের অভিযোগ, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আশায় লেবার পার্টি চীনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে নরম অবস্থান নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক ছায়া মন্ত্রী অ্যালিসিয়া কেয়ার্নস—যিনি ওয়েস্টমিনস্টারের কথিত গুপ্তচর মামলার লক্ষ্যবস্তুদের একজন—বলেছেন, ‘আর কত প্রমাণ লাগবে এই সরকারের, যাতে তারা সি চিনপিংয়ের প্রতি তোষামোদ বন্ধ করে, মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং আমাদের দেশকে রক্ষা করে? লেবার আমাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডকে পুরস্কৃত করছে।’

এই হামলার ফলে চীনা গুপ্তচররা সরকারের শীর্ষ সদস্যদের পাঠানো ও প্রাপ্ত বার্তা পড়তে বা ফোনালাপ শুনতে পেরেছে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি তারা যদি সরাসরি ফোনালাপ শুনতেও না পারে, তবু হ্যাকাররা ‘মেটাডাটা’ পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—কে কাকে কতবার যোগাযোগ করেছে এবং ভৌগোলিক তথ্য, যা থেকে কর্মকর্তাদের আনুমানিক অবস্থান জানা সম্ভব।

ডাউনিং স্ট্রিটে এই হ্যাকিং ছিল বেইজিংয়ের একটি বৈশ্বিক গুপ্তচরবৃত্তি অভিযানের অংশ। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ‘ফাইভ আইজ’ গোয়েন্দা জোটের বাকি তিন দেশ—অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড—লক্ষ্যবস্তু হয়। এই অনুপ্রবেশ অন্তত ২০২১ সাল থেকে শুরু হলেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি জানতে পারে ২০২৪ সালে। এটি প্রকাশ্যে আসে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জানায়—বেইজিং–সম্পর্কিত হ্যাকিং গোষ্ঠীগুলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে চীন লাখো মানুষের ফোনের ডেটায় প্রবেশাধিকার পায়। এতে কল শোনা, বার্তা পড়া এবং ব্যবহারকারীদের অবস্থান ট্র্যাক করার সুযোগ তৈরি হয়।

তৎকালীন মার্কিন উপ–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অ্যান নিউবার্গার বলেন, হ্যাকারদের ‘ইচ্ছেমতো ফোন কল রেকর্ড করার সক্ষমতা’ ছিল। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘প্রমাণহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীদের ফোন থেকে ঠিক কী ধরনের তথ্য চীনা হ্যাকাররা পেয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ব্রিটেনের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বেশি সুরক্ষিত ছিল। তাদের মতে, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার বিষয়ে যুক্তরাজ্য বেশি ‘সতর্ক’ ছিল। তারা ২০২১ সালের টেলিকমিউনিকেশনস সিকিউরিটি অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করেছেন। এই আইনের মাধ্যমে টেলিকম কোম্পানিগুলোর ওপর নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।

তবে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, এই বৈশ্বিক অনুপ্রবেশ ছিল ‘গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে সফল অভিযানের একটি।’ গত বছর এক জনসাধারণের জন্য জারি করা সতর্কবার্তায় এফবিআই জানায়, চীনা ‘রাষ্ট্র–সমর্থিত সাইবার হুমকির কর্মচারীরা’ বিশ্বব্যাপী টেলিযোগাযোগ, সরকারি ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়, চুরি হওয়া এই তথ্য ‘শেষ পর্যন্ত চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সারা বিশ্বের লক্ষ্যবস্তুর যোগাযোগ ও চলাচল শনাক্ত ও অনুসরণ করার সক্ষমতা দেয়।’

এতে আরও বলা হয়, হ্যাকাররা প্রায়ই নেটওয়ার্কে ‘দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী প্রবেশাধিকার’ বজায় রাখে। ফলে এই কার্যক্রম এখনো চলমান থাকতে পারে। এই জনসতর্কবার্তায় যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারসহ (যা জিসিএইচকিউর জনসম্মুখে কাজ করা শাখা) বহু দেশের গোয়েন্দা সংস্থা স্বাক্ষর করেছে।

তবে ‘সল্ট টাইফুনে’ যুক্তরাজ্য আক্রান্ত হয়েছে—এমন একমাত্র সরকারি স্বীকৃতি এসেছে ‘যুক্তরাজ্যে কিছু কার্যকলাপের একটি ক্লাস্টার’ বলে অস্পষ্ট উল্লেখের মাধ্যমে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হামলার ব্যাপকতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তারা স্বীকার করেছেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স ও কামালা হ্যারিসকেও চীনা হ্যাকাররা লক্ষ্যবস্তু করেছিল।

দ্য টেলিগ্রাফকে জানানো হয়, ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীদের ফোন এবং সরকারের বিভিন্ন অংশে ‘অনেক’ আলাদা আলাদা হ্যাকিং হামলা হয়েছিল। বিশেষ করে ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে (২০২২–২০২৪) এসব হামলা বেশি ছিল। গত বছর প্রযুক্তিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর পিটার কাইল বলেন, তিনি তখন ‘খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে আমাদের দেশে একটি সাইবার নিরাপত্তা সংকট রয়েছে, যা আগে সচিব হওয়ার আগে আমি বুঝতেই পারিনি।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের ডাকোটা ক্যারি বলেন, ‘সল্ট টাইফুন মূলত টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি ও তাদের নেটওয়ার্কের ব্যাক–এন্ডে মনোযোগ দিয়েছে, যাতে ব্যক্তিদের মধ্যকার যোগাযোগ সংগ্রহ করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, ব্রিটিশ রাজনীতিতে এমপিদের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে চীন আগ্রহী।’ তিনি সাম্প্রতিক ওয়েস্টমিনস্টার গুপ্তচর মামলার কথা উল্লেখ করেন।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেইজিংকে সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ও সাইবার যুদ্ধে সবচেয়ে দক্ষ ও আক্রমণাত্মক প্রতিপক্ষগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করে। সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রধান ইউভাল ওলম্যান বলেন, সল্ট টাইফুন সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির জগতে ‘সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি।’

সল্ট টাইফুন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250