ফাইল ছবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী সামিট গ্রুপ এবং একটি কথিত বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত আর্থিক সমঝোতার নথি। আলোচনার সূত্রপাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে সামিট কমিউনিকেশনে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মালিকানা রয়েছে এবং একটি বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত চুক্তিতে উল্লেখিত আর্থিক বিষয়াবলি সেই নথিতে উঠে এসেছে।
আজ বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ওই পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের কিছু নথির অংশ প্রকাশ করেন বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো সজীব ওয়াজেদ জয় ও তার সাবেক স্ত্রী ক্রিস্টিনা ওয়াজেদের বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত সেটেলমেন্ট চুক্তির অংশবিশেষ। তিনি দাবি করেন, মোট ৩৪৬ পৃষ্ঠার নথির মধ্যে দুটি পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছে।
পোস্টে আরও দাবি করা হয়, ওই চুক্তিতে জয় এককালীন ১০ লাখ ডলার এবং ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ২০ হাজার ডলার দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এ হিসাব অনুযায়ী, বছরে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং ১০ বছরে ২৪ লাখ ডলার দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে পোস্টে বলা হয়।
তবে এই দাবিগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রকাশিত নথির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ জনসমক্ষে আসেনি, এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষ—সজীব ওয়াজেদ জয়, সামিট গ্রুপ বা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকতা বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত নথি বা ব্যক্তিগত চুক্তির অংশবিশেষ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে যাচাইয়ের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো নথির আংশিক অংশ অনেক সময় সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট তুলে ধরে না।
তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নথির কয়েকটি পৃষ্ঠা প্রকাশিত হলেই সেটিকে পূর্ণাঙ্গ সত্য হিসেবে ধরা যায় না। সাংবাদিকতার একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে—একাধিক উৎস থেকে যাচাই এবং অভিযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া।
দেশের বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে সামিট গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি নাম। বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দর ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করেছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময়েও প্রতিষ্ঠানটি আলোচনায় ছিল। সমালোচকেরা বিভিন্ন সময়ে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সামিট গ্রুপ অতীতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এখন সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় নতুন যে বিষয়টি এসেছে, তা হলো কথিত ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের প্রশ্ন। যদি কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের সঙ্গে বড় কোনো শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক বা মালিকানাগত সম্পর্ক থাকে, তাহলে তা সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের আলোচনায় আসতেই পারে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে যাচাইকৃত দলিল, করপোরেট রেকর্ড এবং আনুষ্ঠানিক তথ্যের ওপর।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে বড় ধরনের প্রকাশ বলে উল্লেখ করছেন, আবার কেউ দাবি করছেন, যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহির রহমান লিখেছেন, “যদি তথ্যগুলো সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত।”
আরেক ব্যবহারকারী সাবিহা নওরীন মন্তব্য করেন, “এখনকার সময়ে স্ক্রিনশট বা নথির অংশ দেখিয়ে অনেক কিছুই দাবি করা হয়। পুরো নথি, আদালতের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিত হওয়া কঠিন।”
আরেক নেটিজেন আরিফুল ইসলাম লেখেন, “জনস্বার্থের প্রশ্ন থাকলে অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ এলেই তা সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।”
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দেশের রাজনীতিতে সামাজিক মাধ্যম এখন তথ্য প্রচারের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে একই সঙ্গে যাচাইবিহীন তথ্য, আংশিক নথি এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দাবির দ্রুত বিস্তারও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
জুলকারনাইন সায়েরের পোস্টে উত্থাপিত দাবিগুলো ইতিমধ্যে রাজনৈতিক আলোচনার নতুন উপাদান হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসব দাবির প্রকৃত ভিত্তি কী, নথিগুলো কতটা প্রামাণ্য, এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী ব্যাখ্যা দেয়—তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে একটি প্রশ্নই: সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সীমা কোথায় শেষ হয়, আর যাচাইকৃত তথ্যের শুরু কোথায়?
খবরটি শেয়ার করুন