ফাইল ছবি
দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী এক নাম কাদের সিদ্দিকী। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের জন্য ‘বঙ্গবীর’ উপাধি পাওয়া এই রাজনীতিক সম্প্রতি এক টকশোতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক অবস্থানে আবারও ফিরে আসবে। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে দলটি আবারও সংকটে পড়তে পারে।
সম্প্রতি একটি টকশোতে কাদের সিদ্দিকী বলেন, “আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে বলে যাচ্ছি, আগামী কয়েক দিনে, কয়েক মাসে আওয়ামী লীগ তার পজিশনে যাবে। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যা করে গদিচ্যুত হয়েছে, তা যদি করে আওয়ামী লীগ আবার ডুববে।”
তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা তৈরি করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন দলের বাইরে থেকেও একজন প্রবীণ রাজনীতিকের এমন মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
কাদের সিদ্দিকী বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে জড়িত একটি দল। তার ভাষায়, “আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের রাষ্ট্রের পিতা।” তবে একই সঙ্গে তিনি এ কথাও বলেন, সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যারা ‘অতিরিক্ত’ করেছেন, তাদের আইনের আওতায় বিচার হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “দেশে আইন-শৃঙ্খলা আছে, আইনের বই আছে, সংবিধান আছে। সেই অনুসারে তাদের বিচার হবে। দরকার পড়লে শেখ হাসিনারও বিচার হবে।”
তবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করেন কাদের সিদ্দিকী। তার মতে, রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, “দলীয়ভাবে নিষিদ্ধ করা, কার্যক্রম বন্ধ রাখা এটা যারা করেছে তারাই অন্যায় কাজ করেছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি, তৃণমূলভিত্তিক উপস্থিতি এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা দলটিকে এখনও বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ধরে রেখেছে। ক্ষমতার বাইরে থাকলেও দলটির সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি বলে তাদের ধারণা।
তারা বলেন, রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক ভাবার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঐতিহাসিক দলগুলো নানা সংকটের মধ্য দিয়েও ফিরে এসেছে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, “তবে জনগণের আস্থা ফিরে পেতে হলে দলটিকে আত্মসমালোচনায় যেতে হবে। প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, দলীয়করণ ও বিরোধী মত দমনের অভিযোগ থেকে বের হতে না পারলে প্রত্যাবর্তন কঠিন হবে।
কাদের সিদ্দিকী তার বক্তব্যে বিএনপিকেও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে বিএনপি একই ধরনের শাসনব্যবস্থা অনুসরণ করে, তাহলে তারাও একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে। তিনি বলেন, “মানুষের কথা শুনতে হবে। মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, এই মন্তব্যে মূলত দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি একটি বার্তা রয়েছে—গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, সহনশীলতা এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কোনো দলই টিকে থাকতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কাদের সিদ্দিকীর বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। অনেকেই তার বক্তব্যকে বাস্তববাদী হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক ভারসাম্যের বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফুল ইসলাম লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের ভুল ছিল, কিন্তু দলটাকে মুছে ফেলা সম্ভব না। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের অবদান আছে।” আরেক ব্যবহারকারী সাদিয়া রহমান মন্তব্য করেন, “রাজনীতিতে প্রতিশোধ নয়, সংস্কার দরকার। কাদের সিদ্দিকী সেটাই বলতে চেয়েছেন।”
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নাজমুল হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার। আওয়ামী লীগ যদি ভুল শুধরে ফিরে আসে, তাহলে গণতন্ত্রের জন্য সেটা ভালো হতে পারে।”
তবে সমালোচনাও কম হয়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, অতীতের নানা অভিযোগের জবাব না দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তন সহজ হবে না।
শারমিন সুলতানা বলেন, “জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। শুধু ঐতিহাসিক পরিচয় দিয়ে আর রাজনীতি করা যাবে না। জবাবদিহি, সুশাসন ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রমাণ দিতে হবে।”
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও কাদের সিদ্দিকীর বক্তব্য ইতিবাচকভাবে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। দলটির কয়েকজন নেতার মতে, দেশের মানুষের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং নানা সংকটের মধ্যেও তৃণমূল পর্যায়ে দলটির একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন উঠছে—আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই আবার ঘুরে দাঁড়ায়, তাহলে সেই প্রত্যাবর্তনের রূপ কেমন হবে? দলটি কি পুরোনো কৌশলেই এগোবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করবে?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের রাজনীতিতে বড় দলগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনআস্থা পুনর্গঠন। আর সেই জায়গায় কাদের সিদ্দিকীর বক্তব্যকে অনেকে সতর্কবার্তা ও সম্ভাবনার মিশ্রণ হিসেবে দেখছেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নে আগামী দিনে আওয়ামী লীগ কী অবস্থান নেয়, সেটিই হয়তো নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ।
খবরটি শেয়ার করুন