ছবি: সংগৃহীত
মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মটাই ছিল তার ঘর। সেই প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দিতেন, আবর্জনা পরিষ্কার করতেন, যাত্রীদের ফেলে যাওয়া ময়লা সরিয়ে রাখতেন। বিনিময়ে দোকানদারদের কাছ থেকে কেউ দিতেন ১০ টাকা, কেউ ২০ টাকা। কেউ খাবার দিতেন, কেউ পুরোনো কাপড়। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন শুধু ‘বুবি’ নামে। সেই বুবি বেগম (৭০) শেষ পর্যন্ত বাঁচলেন না।
নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনে ছিনতাইকারীদের নির্মম হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার চার দিন পর গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়েছে। রায়পুরার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বিষয়টি আজ বুধবার সন্ধ্যার পর মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় ২৫ বছর আগে একদিন ট্রেনে চড়ে মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনে এসে নেমেছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী এই নারী। এরপর তিনি আর কোথাও ফিরে যাননি। স্টেশনই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী ঠিকানা। সময়ের সঙ্গে স্টেশনের দোকানদার, হকার, রেলযাত্রী ও আশপাশের মানুষ তাকে আপন করে নেন। কেউ তার প্রকৃত পরিচয় জানতেন না, জানতেন না কোনো স্বজনের খোঁজও। কিন্তু সবাই চিনতেন তাকে—স্টেশন পরিষ্কার করা এক নীরব বৃদ্ধা হিসেবে।
স্থানীয়দের মতে, বুবি কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন না। নিজের উদ্যোগেই প্রতিদিন প্ল্যাটফর্ম ও স্টেশনের আশপাশ পরিষ্কার করতেন। সেই কাজের বিনিময়ে দোকানদারদের কাছ থেকে কিছু অর্থ পেতেন। কাজের পাশাপাশি মাঝে মাঝে ভিক্ষাও করতেন। যাত্রী ও স্থানীয়দের দেওয়া সহায়তা এবং প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করে পাওয়া সামান্য টাকাই ছিল তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সেই সামান্য আয়ের মধ্য থেকেই অল্প অল্প করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। হয়তো বার্ধক্যের দিনগুলো একটু নিশ্চিন্তে কাটানোর স্বপ্ন ছিল সেই সঞ্চয়ে। কিন্তু সেই টাকাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে কয়েক দুর্বৃত্ত বুবির কক্ষে ঢুকে তার কাছে টাকা দাবি করে। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দুর্বৃত্তরা তাকে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে কক্ষে লুকিয়ে রাখা প্রায় ৪০ হাজার টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।
পরদিন সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। শুরুতে তার চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
বুবির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মেথিকান্দা স্টেশন এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। যাদের কাছে তিনি ছিলেন প্রতিদিনের পরিচিত মুখ, তারা বলছেন, স্টেশন এখন যেন অনেকটাই শূন্য হয়ে গেল। যে নারী প্রতিদিন ভোরে ঝাড়ু হাতে প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করতেন, সেই মানুষটির শেষ পরিণতি এমন হবে—এটি কেউ কল্পনাও করেননি।
হামলার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বুবির আহত অবস্থার একটি ভিডিও। ভিডিওতে অসহায় বৃদ্ধাকে দেখে অসংখ্য মানুষ ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করেন। কয়েক লাখ মানুষ ভিডিওটি দেখেছেন এবং হাজারো মন্তব্যে জড়িয়ে পড়েন আবেগঘন আলোচনায়।
ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফ হাসান মন্তব্য করেন, একজন বৃদ্ধা সারাজীবন মানুষের জন্য স্টেশন পরিষ্কার করলেন, আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকে সামান্য টাকার জন্য পিটিয়ে হত্যা করা হলো। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, আমাদের মানবিকতারও পরাজয়। সাবরিনা রহমান লেখেন, “ভিডিওটি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। সমাজ যদি একজন অসহায় বৃদ্ধাকেও নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে আমাদের উন্নয়নের দাবি কতটা অর্থবহ—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।”
আরেক ব্যবহারকারী রুবেল আহমেদ মন্তব্য করেন, “যারা এই অপরাধ করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। নইলে এমন অপরাধ আরও বাড়বে।” মৌসুমী আক্তার’ লিখেছেন, “বুবির কোনো পরিবার ছিল না, কিন্তু মৃত্যুর পর পুরো দেশ যেন তার পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছে। এই ভালোবাসা যদি তিনি জীবিত অবস্থায় আরও বেশি পেতেন!”
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বুবির চিকিৎসা ও সহায়তায় এগিয়ে আসে। অনেকেই চিকিৎসার ব্যয় বহনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে না–ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই বৃদ্ধা। ইউএনও মো. মাসুদ রানা জানান, ময়নাতদন্ত শেষে বুবির মরদেহ রায়পুরাতেই দাফন করা হবে।
তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ৫ জুলাই রাতেই এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মেথিকান্দা স্টেশনের অনেক প্রবীণ বাসিন্দা বলছেন, বুবির জীবন ছিল নীরব সংগ্রামের প্রতীক। নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা এক নারী, যিনি একটি রেলস্টেশনকে নিজের ঘর বানিয়েছিলেন। মানুষের ফেলে যাওয়া ময়লা পরিষ্কার করে, অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সঞ্চিত অর্থই তাকে নির্মম সহিংসতার শিকার বানাল।
বুবির গল্প এখন শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের খবর নয়; এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তা, মানবিকতা এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যে নারী জীবনের শেষ ২৫ বছর একটি স্টেশনকে পরিচ্ছন্ন রাখতে নীরবে কাজ করে গেছেন, তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যেন আরও একবার সামনে এসেছে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষদের নিরাপত্তাহীন বাস্তবতা।
মেথিকান্দা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আজও ট্রেন আসে, ট্রেন যায়। মানুষের ভিড়ও আগের মতোই থাকে। শুধু আর দেখা যাবে না ঝাড়ু হাতে নীরবে ঘুরে বেড়ানো সেই বৃদ্ধাকে, যাকে সবাই চিনত ‘বুবি’ নামে। তার অনুপস্থিতি হয়তো সবচেয়ে বেশি অনুভব করবেন সেই যাত্রীরাই, যারা প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন একটি প্ল্যাটফর্ম দেখলেও কখনো ভাবেননি—এই নীরব শ্রমের পেছনে ছিল এক অসহায় নারীর দীর্ঘ জীবনের সংগ্রাম।
খবরটি শেয়ার করুন