ছবি: সংগৃহীত
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে কিশোর বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়েছিলেন আলফু মিয়া। পরিবারের কাউকে কিছু না বলে চলে যাওয়া সেই ছেলেটির খোঁজে বহু বছর অপেক্ষা করেছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একসময় খবর আসে, তিনি আর বেঁচে নেই।
তবে তার মৃত্যুর দুই দশক পর বাবার শিকড়ের টানে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে এসেছেন তার ছেলে সিদ্দিক খান ওরফে ওমর সাদিক। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের পর দুই দেশের দুই প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা একটি পরিবারের পুনর্মিলনের এই গল্প এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের গাজীপুর চা-বাগান এলাকায় সিদ্দিকের আগমন যেন এক আবেগঘন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আত্মীয়স্বজনেরা তাকে ঘিরে স্মৃতিচারণা করছেন, আর সিদ্দিক চেষ্টা করছেন বাবার শৈশব, পরিবার ও পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে জানার।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্দিকের দাদা আত্তর মিয়া স্থানীয় একটি চা-বাগানে গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার তিন ছেলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন আলফু মিয়া। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি এক পাকিস্তানি নাগরিকের সঙ্গে দেশ ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। পরে পাকিস্তানেই তিনি বড় হন, বিয়ে করেন এবং নতুন জীবন শুরু করেন।
দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ না থাকলেও ২০০০ সালে স্ত্রী কসর পারভিন ও দুই বছর বয়সী ছেলে সিদ্দিককে নিয়ে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন আলফু মিয়া।
কিন্তু সেই সফর সুখের হয়নি। দেশে আসার মাত্র তিন দিনের মাথায় তার স্ত্রী মারা যান। স্ত্রীর মরদেহ নিয়ে পাকিস্তানে ফিরে যান তিনি। এরপর আবারও যোগাযোগের সুতো ছিঁড়ে যায়। ২০০৬ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আলফু মিয়ার মৃত্যু হয়। তখনও বাংলাদেশে থাকা তার আত্মীয়স্বজন এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। দুই দেশের দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব এবং সময়ের ব্যবধানে একসময় প্রায় হারিয়েই যায় সম্পর্কের শেষ চিহ্নটুকু।
কয়েক মাস আগে ঘটনাপ্রবাহে নতুন মোড় আসে। ‘বঙ্গ ভিটা’ নামে একটি ফেসবুক পেজে আলফু মিয়ার সন্ধান চেয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টে তার বাংলাদেশ সফরের সময় তোলা কয়েকটি পুরোনো ছবিও যুক্ত করা হয়। সেই পোস্ট নজরে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাকিস্তানি শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ তাহির ওয়াহিদের। কৌতূহলবশত তিনি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন।
পরে ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের সহায়তায় আলফু মিয়ার পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায়। তখন জানা যায়, আলফু বহু আগেই মারা গেছেন। তবে জীবিত আছেন তার ছেলে সিদ্দিক খান। এরপর শুরু হয় দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ। বহু বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে স্বজনেরা জানতে পারেন, তাদের হারিয়ে যাওয়া পরিবারের একটি অংশ এখনো বেঁচে আছে।
চলতি বছরের ২২ মার্চ তিন মাসের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন সিদ্দিক। একাই এসেছেন তিনি। কুলাউড়ায় পৌঁছানোর পর তাকে ঘিরে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। আত্মীয়স্বজনেরা একে একে এসে পরিচয় দেন। কেউ তার বাবার গল্প শোনান, কেউ দেখান পুরোনো ছবি, কেউবা নিয়ে যান পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই কৌতূহল নিয়ে তাকে দেখতে আসেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের পার্থক্য থাকলেও খুব দ্রুত সবার সঙ্গে মিশে গেছেন সিদ্দিক। এরই মধ্যে তিনি গাজীপুর চা-বাগানে তাদের পূর্বপুরুষের বাড়ির স্থান ঘুরে দেখেছেন। আশপাশের এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে উঠেছে।
সিদ্দিক জানান, বাবার মৃত্যুর পর গোলাম সরদার নামের এক ব্যক্তি তাকে লালন-পালন করেছেন। তিনি তাকে চাচা বলে ডাকেন। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে তার বসবাস। ২০২১ সালে বিয়ে করেছেন। বর্তমানে তিনি পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
বাংলাদেশে ছোটবেলায় এলেও সেই সফরের কোনো স্মৃতি তার মনে নেই। তবে এবার এসে তিনি নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন নিজের শেকড়কে। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে কিছু বাংলা শব্দও শিখেছেন। উর্দুর পাশাপাশি ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করেন। এতে স্থানীয়দেরও বেশ ভালো লাগছে।
বাংলাদেশ সম্পর্কে অনুভূতি জানতে চাইলে সিদ্দিক বলেন, এখানে এসে তিনি নিজের পরিবারের একটি হারিয়ে যাওয়া অংশকে ফিরে পেয়েছেন। আত্মীয়স্বজনদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা তাকে মুগ্ধ করেছে। তার ভাষায়, ‘খুব ভালো লাগছে। আত্মীয়স্বজনকে দেখে মন ভরে গেছে।’
এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ফেসবুকে অনেকেই এটিকে মানবিক ও আবেগঘন পুনর্মিলনের গল্প হিসেবে উল্লেখ করছেন।
নেটিজেন রায়হান আহমেদ মন্তব্য করেন, “সীমানা মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু রক্তের সম্পর্ককে কখনো মুছে দিতে পারে না। সিদ্দিকের গল্প সেটাই প্রমাণ করল।” সামিয়া নওরীন নামের এক ব্যবহারকারী লেখেন, “এ ধরনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের নানা ঘটনার আড়ালে কত মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও বিচ্ছেদের গল্প লুকিয়ে থাকে।”
আরেক ব্যবহারকারী মাহিন চৌধুরী বলেন, “যে তরুণ কখনো নিজের শেকড়কে চিনতেন না, তিনি আজ সেই শেকড়ের কাছে ফিরে এসেছেন। এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, মানবিক সম্পর্কেরও জয়গান।”
স্থানীয়দের অনেকেই আশা করছেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সিদ্দিক দেশের আরও বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখবেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশে আসা-যাওয়া অব্যাহত রাখবেন।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে যে কিশোর একদিন নীরবে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তার জীবনের গল্প হয়তো অসম্পূর্ণই থেকে গেছে। কিন্তু তার ছেলে সিদ্দিকের এই সফর সেই গল্পে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সম্পর্কের সুতো আবারও জোড়া লেগেছে। আর সেই পুনর্মিলনের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দুই প্রান্তে থাকা স্বজনেরা।
খবরটি শেয়ার করুন