ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে আসার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ‘র’-এর কথিত বৈঠক এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সারওয়ার ফরিদের দিল্লি সফর ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার বৈঠকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট নেতা। অন্যদিকে এনএসআই প্রধানের দিল্লি সফরকে বহুপক্ষীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী সম্মেলনে অংশগ্রহণের সফর বলে জানিয়েছে নিরাপত্তা সূত্র।
এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে গোপন সমঝোতার অভিযোগ, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনার প্রশ্ন এবং ঢাকা-নয়াদিল্লির নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বিরুদ্ধে ভারতের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন বৈঠকের অভিযোগ তোলেন। এর আগের দিন ২৫ অক্টোবর, এনএসআইয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সারওয়ার ফরিদ দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ২৫ অক্টোবর রাতে চার দিনের সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।
রাশেদ খান ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ১৬ অক্টোবর রাজধানীর বারিধারা এলাকায় একটি বাসায় ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে গোলাম পরওয়ারের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে জামায়াত নেতা এটিএম মাছুমসহ মোট তিনজন অংশ নেন। রাশেদের অভিযোগ, ভারতের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া জামায়াত নেতারা কেন দেশটির গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে গোপনে বৈঠক করবেন, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।
বৈঠকের অভিযোগ তুলে রাশেদ খান আরও দাবি করেন, গোলাম পরওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার না করলে আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে জামায়াতের আন্দোলনের পরিকল্পনা সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হবে। তার বক্তব্যে এই কথিত বৈঠককে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সম্ভাব্য অংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। গোলাম পরওয়ার এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে তার বৈঠকের দাবি সম্পূর্ণ অসত্য ও আজগুবি। এ ধরনের বৈঠকের প্রশ্নই আসে না বলে তিনি জানান।
এর মধ্যেই এনএসআই প্রধানের দিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ভারতের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম সফরটিকে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা যোগাযোগ এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখছে। তবে ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারওয়ার ফরিদ দিল্লিতে গেছেন অষ্টম দক্ষিণ এশীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী সম্মেলনে অংশ নিতে। ২৫ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত চার দিনের এ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা।
ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদনে এনএসআইয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, মহাপরিচালক ২৫ অক্টোবর এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজে দিল্লি যান এবং ২৮ অক্টোবর তার দেশে ফেরার কথা। ওই সূত্র সফরটিকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হিসেবে দেখানোর প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে জানায়, এটি বহুপক্ষীয় সম্মেলন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নবভারত টাইমস ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে এনএসআই প্রধানের দিল্লি সফর এবং বাংলাদেশের অন্য কর্মকর্তাদের চীন সফরের বিষয়টি পাশাপাশি তুলে ধরে। সংবাদমাধ্যমটি এ ঘটনাকে ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করেছে। কিন্তু ওই দুই সফরের মধ্যে সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনএসআই প্রধানের আকস্মিক দিল্লি সফর ঘিরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে সফরের উদ্দেশ্য এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে এই সফরের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এনএসআই প্রধানের সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিজের ঘোষণাও। গত ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে এসে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। এরপর ৫ আগস্ট ভারতের নয়াদিল্লি থেকে অডিওর মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
এনএসআই প্রধানের সফরে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা হবে কি না, তা বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো সরকারিভাবে প্রকাশিত বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়নি। একইভাবে, ‘র’-এর কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে জামায়াত নেতাদের কথিত বৈঠকের সঙ্গে এনএসআই প্রধানের দিল্লি সফরের সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্যও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে কথিত ঐক্যের অভিযোগ ঘিরে। গত ১ অক্টোবর ফেনীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও সমঝোতা হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন। পরে ২০ অক্টোবর রাজশাহীতে এক জনসভায় তিনি বলেন, তার কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও দেশের ভেতরে সক্রিয় একটি রাজনৈতিক শক্তি একসঙ্গে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। বক্তব্যে তিনি সরাসরি দুই দলের নাম না বললেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তার বক্তব্যকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে দেওয়া বলে উল্লেখ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার বাস্তব প্রয়োজনও রয়েছে। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, আন্তসীমান্ত অপরাধ, মানব পাচার, মাদক পাচার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং মিয়ানমারের সংঘাতজনিত পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত তথ্য বিনিময় দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাবও এ অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। এ ধরনের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশ নেওয়া কিংবা যোগাযোগ রাখা অস্বাভাবিক নয়।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে আসার মধ্যে এনএসআই প্রধানের দিল্লি সফর এবং জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ‘র’-এর কথিত বৈঠকের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু দুটি ঘটনাকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখানোর মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই।
খবরটি শেয়ার করুন