ফাইল ছবি
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে। বহুদিন পর বড় পরিবর্তন আসছে তাদের বেতনকাঠামোয়। এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি মানুষের আয়কে চাপে ফেলেছে। নির্দিষ্ট আয়ের কর্মীদের সেই চাপ আরও বেশি। তবে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শুধু কর্মচারীদের আয় বাড়ানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত। জড়িত মূল্যস্ফীতি। জড়িত রাজস্ব আদায়। জড়িত ভবিষ্যতের পেনশন ব্যয়। আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসছে। বেতন বাড়ার সঙ্গে সরকারি সেবার মানও কি বাড়বে? এই প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নতুন বেতনকাঠামোয় ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বাড়বে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে বাড়বে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ। বিভিন্ন ভাতাও আনুপাতিক হারে বাড়বে। নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ভাতা দেওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোয় আছেন। এই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। তাই বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক থাকার কথা নয়। প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থনীতি কীভাবে সামলানো হবে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনও সরকারি কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেছিল। কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল। কমিশনের হিসাবে, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বর্তমানে বছরে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে কমিশন জানিয়েছিল। এটি বড় অঙ্কের অর্থ। তাই বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতার পাশাপাশি অর্থের সংস্থানের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হচ্ছে মূলত তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে। কিন্তু এখানে একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা তৈরি হয়। বেতন বাড়লে নাগরিক সেবার মানও বাড়বে। একজন নাগরিক সরকারি দপ্তরে গেলে দ্রুত সেবা পাবেন। ফাইল আটকে থাকবে না। অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আসবে। এটাই হওয়া উচিত। কারণ সরকারি কর্মচারীদের বেতন আসে জনগণের অর্থ থেকে। সেই অর্থ আসে কর ও অন্যান্য সরকারি রাজস্ব থেকে। তাই বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশাও বাড়বে। বেতন বাড়ল অথচ সেবার মান একই রইল, তাহলে প্রশ্ন উঠবে। বাড়তি ব্যয়ের বিনিময়ে জনগণ কী পেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই ভাবতে হবে।
সরকারি চাকরিতে বেতন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি একমাত্র বিষয় নয়। কর্মদক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মচারী কত দ্রুত কাজ করছেন, কতটা নির্ভুলভাবে করছেন এবং নাগরিককে কতটা ভালো সেবা দিচ্ছেন—এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসা উচিত। বর্তমানে অনেক সরকারি সেবা ডিজিটাল হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি চালু হলেই সেবা সহজ হয় না। প্রক্রিয়া জটিল থাকলে প্রযুক্তিও নাগরিককে স্বস্তি দিতে পারে না।
তাই নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে সরকারি সেবা সংস্কারের বিষয়টি যুক্ত করা দরকার। কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন আরও কার্যকর করা যেতে পারে। দপ্তরভিত্তিক সেবার সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। নাগরিক অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যে কর্মকর্তা বা কর্মচারী ভালো সেবা দিচ্ছেন, তাঁর স্বীকৃতির ব্যবস্থাও থাকা দরকার। একইভাবে দীর্ঘসূত্রতা ও দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বেতন বৃদ্ধিকে শুধু সুবিধা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি দেখা হবে না। এর সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ যখন বেশি, তখন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ হতে হয়। একজন সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়লে তার জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে তার কাজের মানও উন্নত হওয়া উচিত। একটি সরকারি অফিসে নাগরিককে যদি আগের মতোই দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। সুতরাং নতুন কাঠামোর সাফল্য শুধু বেতন কত শতাংশ বাড়ল, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মাপতে হবে সেবার গতি দিয়ে। মাপতে হবে দক্ষতা দিয়ে। মাপতে হবে নাগরিকের সন্তুষ্টি দিয়ে।
সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতার জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এটি ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে ব্যয় আরও বাড়বে। এখানে শুধু চলতি বছরের হিসাব করলেই হবে না। ভবিষ্যৎ ব্যয়ের কথাও ভাবতে হবে। কারণ বেতন বাড়লে ভবিষ্যতে পেনশন ব্যয়ও বাড়বে। এ ছাড়া বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার ব্যয়ও বাড়তে পারে। রাষ্ট্রের আয় একই হারে না বাড়লে এই ব্যয় সামলানো কঠিন হবে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। কর ফাঁকি কমাতে হবে। কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করতে হবে। ডিজিটাল করব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে। কারণ সরকারের অর্থের উৎস সীমিত। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করতে হবে। সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।
বেতন বাড়লে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। মানুষ বেশি পণ্য ও সেবা কিনতে পারবেন। বাজারে চাহিদা বাড়বে। তবে সরবরাহ যদি সেই অনুপাতে না বাড়ে, কিছু ক্ষেত্রে মূল্যচাপ তৈরি হতে পারে। তাই বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতির সমন্বয় দরকার। তবে বেতন বৃদ্ধি নিজেই মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ—এমন সরল সিদ্ধান্তেও যাওয়া ঠিক হবে না। মূল্যস্ফীতির পেছনে খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য, বিনিময় হার ও উৎপাদন খরচসহ নানা কারণ থাকে।
নতুন কাঠামো একবারে কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমবে। বড় অঙ্কের ব্যয় একবারে না করে কয়েক ধাপে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে কর্মচারীদের জন্য এতে অপেক্ষার বিষয়টি থেকে যায়। কাগজে বেতন বৃদ্ধির হার বেশি হলেও পুরো সুবিধা পেতে সময় লাগবে। মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় কর্মচারীরা দ্রুত বাড়তি আয় চান। ফলে বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। এটি সামলাতে সরকারকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
নতুন বেতনকাঠামোকে শুধু বেতন বাড়ানোর কর্মসূচি হিসেবে দেখলে সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগানো হবে না। এটি সরকারি প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের সুযোগও হতে পারে। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার মানের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোন সেবা কত দিনে দিতে হবে, সেটি স্পষ্ট করা যেতে পারে। ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করা দরকার। কর্মদক্ষতার মূল্যায়নকে বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে বেতন বৃদ্ধি শুধু ব্যক্তিগত আয় বাড়াবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানও আরও কার্যকর হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় একই কাঠামোয় থাকার পর বড় ধরনের সমন্বয়ও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সক্ষমতার বিষয়টিও ভুলে গেলে চলবে না। বেতন বাড়বে। ভাতা বাড়বে। ভবিষ্যতে পেনশন ব্যয়ও বাড়বে। তাই রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকতে হবে। ব্যয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে সেবার মান। জনগণ বাড়তি বেতনের বিরোধিতা করবেন না।
বরং তারা চাইবেন, বাড়তি ব্যয়ের বিনিময়ে সরকারি সেবাও উন্নত হোক। সরকারি অফিসে কাজ দ্রুত হোক। হয়রানি কমুক। সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আসুক। জবাবদিহি বাড়ুক। একটি ভালো বেতনকাঠামোর আসল সাফল্য এখানেই। কারণ সরকারি কর্মচারীদের বেতন শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থে দেওয়া হয়। সেই অর্থের বিনিময়ে জনগণ আরও দক্ষ, দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। নতুন বেতনকাঠামো তাই শুধু বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়। এটি রাষ্ট্রের কর্মদক্ষতা বাড়ানোরও একটি সুযোগ। এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ। সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক।
খবরটি শেয়ার করুন