ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর এজলাসে প্রবেশের মুহূর্তটি ছিল কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওই আজ মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার আগে হাজতখানা থেকে আদালতে আনা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে কাঠগড়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
এ সময় দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্য তার হাত ধরতে গেলে ইনু আঙুল উঁচিয়ে বলেন, “এই হাত ধরবেন না, ভদ্রতা শিখুন।” ভিডিওতে তাকে দৃশ্যত উত্তেজিত অবস্থায় দেখা যায়।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর ১টা ৪২ মিনিটের দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর এজলাসে তাকে তোলা হয়। কিছুক্ষণ পর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। মামলায় আটটি অভিযোগ আনা হলেও ট্রাইব্যুনাল তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন। তবে সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তাকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
আদালতে তোলার সময় ইনুর আচরণ এবং পুলিশ সদস্যকে উদ্দেশ করে করা মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল এবং এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ব্যাপকভাবে শেয়ার হতে থাকে। এর পরপরই শুরু হয় নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা।
অনেকে মন্তব্য করেন, আদালতে একজন আসামির মর্যাদা রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনও গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যরা বলেন, কোনো আসামির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক স্পর্শ বা অমর্যাদাকর আচরণও কাম্য নয়।
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আদালতে হাজিরার সময় আসামিদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেছেন, নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে আসামিদের ধাক্কাধাক্কি, অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাত ধরে টানা, বা অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আবার পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আদালত প্রাঙ্গণের পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক সময় দ্রুততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে প্রতিটি ঘটনাই নিজস্ব প্রেক্ষাপটে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
ইনুর ভিডিও নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দুই ধরনের। ঢাকার বাসিন্দা আরিফ রহমান লিখেছেন, “রায় যাই হোক, একজন আসামির সঙ্গেও শালীন আচরণ করা উচিত। আইন সবার জন্য সমান।”
অন্যদিকে রাজশাহীর সাদিয়া ইসলাম মন্তব্য করেন, “ক্ষমতায় থাকাকালে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কঠোর ব্যবহার সমর্থন করেছেন, তাদের মুখে এখন ভদ্রতার কথা শুনে অনেকেই বিস্মিত হচ্ছেন।” চট্টগ্রামের মাহমুদ হাসান লিখেছেন, “ভিডিওর কয়েক সেকেন্ড দেখে পুরো ঘটনা বিচার করা ঠিক হবে না। আগে জানা দরকার কী পরিস্থিতিতে এই কথোপকথন হয়েছে।”
যশোরের নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশ ও আসামি—উভয় পক্ষেরই সংযত আচরণ প্রত্যাশিত।” খুলনার রায়হান কবীর লেখেন, “ভিডিওটি যতটা না আইনি আলোচনা তৈরি করেছে, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।” এ ধরনের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, ঘটনাটিকে কেউ দেখছেন মানবিক আচরণের প্রশ্ন হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন রাজনৈতিক প্রতীকী বার্তা হিসেবে।
হাসানুল হক ইনু দেশের বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ। ছাত্রজীবনে রাজনীতির মাধ্যমে তার উত্থান। পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসেবেও তিনি দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় অভিযোগ ছিল, কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আন্দোলন দমনে বিভিন্ন ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন আটটি অভিযোগ আনে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেন এবং বাকি পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করেন।
রায়ের পর প্রধান প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, তারা এই রায়ে সন্তুষ্ট নন এবং সাজা বৃদ্ধি ও খালাস পাওয়া অভিযোগগুলোর বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ফলে বিষয়টি এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত প্রাঙ্গণে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং মানবিক আচরণ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একজন আসামি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আইনের দৃষ্টিতে নির্দিষ্ট অধিকার ভোগ করেন, আবার আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বর্তায়। ফলে এ ধরনের ঘটনা সামনে এলে আবেগ নয়, বরং তথ্য ও প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
তবে এটাও সত্য যে, আদালতে নেওয়ার সময় আসামিদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে ইনুর এই ভিডিওকে ঘিরে। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতবার দেখা হয়েছে, ততবারই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব পালনের ধরন কেমন হওয়া উচিত, আর আদালতে উপস্থিত একজন আসামির আচরণের সীমারেখাই-বা কোথায়। আপাতত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু।
খবরটি শেয়ার করুন