রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার, হতাশা ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি: রুমিন ফারহানার মন্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০১:২৭ অপরাহ্ন, ১৪ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেই অভ্যুত্থানের দুই বছর না পেরোতেই এর অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপির সাবেক নেতা রুমিন ফারহানার মন্তব্য—“আগামী ১০০ বছরেও দেশে আর কোনো গণ-অভ্যুত্থান হবে না”—এবার সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তার এই বক্তব্যকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেছেন, মন্তব্যটির পেছনের কারণ নিয়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন।

নিজের ফেসবুকভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘কথা’-তে দেওয়া বক্তব্যে মাসুদ কামাল গতকাল সোমবার (১৩ জুলাই) বলেন, রুমিন ফারহানা নিজেও এক অর্থে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সুফলভোগী। কারণ, ওই অভ্যুত্থান না হলে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটত না এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও তৈরি হতো না। তার প্রশ্ন, সেই বাস্তবতার সুবিধাভোগী একজন রাজনীতিক কেন বলছেন যে আগামী এক শতাব্দীতেও আর কোনো গণ-অভ্যুত্থান হবে না? এটি কি ক্ষোভ, অভিমান নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার হিসাব-নিকাশ থেকে দেওয়া মন্তব্য—সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

মাসুদ কামালের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে ২০২৪ সালের আন্দোলনের চরিত্র। তার মতে, এটি কোনো একক রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন বা নেতৃত্বের আন্দোলন ছিল না; বরং ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলনে ভূমিকা রাখলেও সরকারের পতন ঘটেছে মূলত সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে। জনগণ যদি রাস্তায় না নামত, তাহলে শুধু সংগঠিত রাজনৈতিক উদ্যোগে সেই পরিবর্তন সম্ভব হতো না।

এই বক্তব্য দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা তুলে ধরে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, গণ-অভ্যুত্থান ও সাধারণ রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো আন্দোলন তখনই গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যখন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একটি অভিন্ন দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৪ সালের ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক একটি ‘জনঅভ্যুত্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তবে মাসুদ কামালের বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, সরকারের পতনের পর জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং আন্দোলনের পর নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিত থাকে। তার ভাষায়, “সুবিধাভোগীরা নেতৃত্ব নিয়ে কামড়াকামড়ি করেছেন” এবং জনগণের প্রত্যাশাকে “নির্মমভাবে হত্যা” করা হয়েছে।

এই পর্যবেক্ষণটি রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সঙ্গেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। রুমিন ফারহানা বলেছেন, ২০২৪ সালে মানুষ শেষবারের মতো জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু পরে তারা দেখেছে, আন্দোলনটি কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়ায় উগ্রবাদের উত্থান ঘটেছে এবং কেউ কেউ অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ফলে ভবিষ্যতে মানুষ নতুন কোনো গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার আগে বহুবার চিন্তা করবে।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হলে ‘বিপ্লব-পরবর্তী হতাশা’ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাসে ফ্রান্স, মিসর, তিউনিসিয়া কিংবা ইউক্রেন—বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তনের পর যদি সুশাসন, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক উন্নতির দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসে, তাহলে জনগণের মধ্যে দ্রুত হতাশা জন্ম নেয়। এতে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও প্রভাবিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ইমতিয়াজ আহমেদ বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় বলেছেন, গণ-আন্দোলনের সাফল্য শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক হয়, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, আন্দোলনের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হলে রাজনৈতিক অবিশ্বাস বাড়ে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সুশাসনবিষয়ক গবেষক ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও। তিনি বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।

তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, রুমিন ফারহানার “১০০ বছরেও আর গণ-অভ্যুত্থান হবে না” মন্তব্যটি আক্ষরিক অর্থে না দেখে রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। তাদের মতে, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে জনগণ যদি মনে করে তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, তাহলে ভবিষ্যতে একই মাত্রার ঝুঁকি নিতে তারা অনাগ্রহী হতে পারে।

অন্যদিকে, কয়েক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাদের যুক্তি, ইতিহাসে কোনো সমাজেই গণ-অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে যায় না। যখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে এবং প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন নতুন আন্দোলনের সম্ভাবনা আবারও তৈরি হতে পারে। তাই “১০০ বছর” কথাটি রাজনৈতিক ভাষার অলংকার হিসেবেই বেশি বিবেচিত হতে পারে।

মাসুদ কামালের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার মতে, অনেকেই এখন নিজেদের আন্দোলনের প্রধান শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চান। কিন্তু বাস্তবে জনগণের অংশগ্রহণই ছিল সরকারের পতনের মূল কারণ। এই বিশ্লেষণটি বর্তমান রাজনৈতিক বয়ানেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা এখনও স্পষ্ট।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসে ‘ন্যারেটিভের লড়াই’ একটি স্বাভাবিক বিষয়। যে পক্ষ জনগণের কাছে আন্দোলনের বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, ভবিষ্যতের নির্বাচনী রাজনীতিতেও সে সুবিধা পায়। ফলে আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র, নেতৃত্ব এবং অর্জন নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘ সময় ধরে চলতেই পারে।

রুমিন ফারহানা ও মাসুদ কামালের বক্তব্য তাই শুধু দুই ব্যক্তির মতামত নয়; বরং এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, জনগণের প্রত্যাশা এবং গণ-অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার নিয়ে বড় একটি বিতর্কের প্রতিফলন। একদিকে রয়েছে আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্বীকৃতি, অন্যদিকে রয়েছে সেই পরিবর্তনের ফলাফল নিয়ে হতাশা ও প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে তার ওপর। যদি গণতন্ত্র, জবাবদিহি, সুশাসন এবং আইনের শাসন শক্তিশালী হয়, তাহলে আন্দোলনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে। আর যদি জনগণ মনে করে তাদের আত্মত্যাগ কেবল নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরির পথ খুলে দিয়েছে, তাহলে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

সে কারণেই মাসুদ কামাল রুমিন ফারহানার মন্তব্যকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এই মন্তব্যকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার চেয়ে জনগণের মনস্তত্ত্ব, আন্দোলনের উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাজনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ, কোনো গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল তার মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়; বরং সেই পরিবর্তন জনগণের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, সেটির মধ্যেই নিহিত থাকে।

রুমিন ফারহানা মাসুদ কামাল ড. ইফতেখারুজ্জামান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250