রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

ছাদ চুইয়ে পড়া পানির নিচে পরীক্ষা—একটি ভিডিওতেই উঠে এলো শিক্ষা অবকাঠামোর দুর্দশা

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৮:২৩ অপরাহ্ন, ১৩ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

বৃষ্টির পানি টুপটাপ করে পড়ছে শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে। বেঞ্চের ওপর রাখা উত্তরপত্র ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে কলম। এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কোটখালী ফাজিল মাদ্রাসার কয়েক শিক্ষার্থীকে। ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সংকট নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল রোববার। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের ছাদের বিভিন্ন অংশ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে। কোথাও কোথাও পানি এড়াতে শিক্ষার্থীরা বেঞ্চ সরিয়ে বসেছে। আবার কয়েক শিক্ষার্থী ছাতা মাথায় দিয়ে পরীক্ষার খাতা লিখছে। ভিডিওটি অনেকের কাছেই শুধু একটি ভাইরাল দৃশ্য নয়, বরং দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছে।

মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মো. কাওসার আহমেদ জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। ইবতেদায়ী প্রথম শ্রেণি থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত পাঠদান চালাতে অন্তত ২০টি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ছয়টি। ফলে একই ভবনে একাধিক শ্রেণির কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। পুরোনো ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়লেও বিকল্প কক্ষের অভাবে সেখানেই পরীক্ষা নিতে হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মাওলানা মো. নজির আহমেদ আজ সোমবার মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসার ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় অত্যন্ত জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষা এলেই ছাদের বিভিন্ন অংশ দিয়ে পানি পড়ে। এতে নিয়মিত পাঠদান যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি পরীক্ষা গ্রহণও কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।

তিনি জানান, একটি নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। তবে কাজের গতি ধীর হওয়ায় সেটি এখনো শেষ হয়নি। ভবনটি ব্যবহার উপযোগী হতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো শিক্ষার্থী যেন নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দিতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ। শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই বা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শেখার পরিবেশও শিক্ষার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি শ্রেণিকক্ষ যদি বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায়, সেখানে শিক্ষার্থীর মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতি শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি ছাতা ধরে পরীক্ষা দেয়, কেউ আবার শুকনো পরিবেশে পরীক্ষা দেয়, তাহলে সেটি সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোর দুর্বলতা থাকলে সেটি শুধু ভবনের সমস্যা নয়, শিক্ষার মানেরও সমস্যা।

তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ভবন নিয়মিত পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সায়েদুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনের নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা উচিত। কোনো ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়া শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়; এটি ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতারও ইঙ্গিত হতে পারে। সময়মতো সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই ঘটনাটিকে দেশের শিক্ষা অবকাঠামোর বাস্তব চিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফুল ইসলাম লিখেছেন, "যে দেশে শিক্ষার্থীরা ছাতা মাথায় পরীক্ষা দেয়, সেখানে উন্নয়নের বড় বড় গল্প শুনলে প্রশ্ন জাগে—শিক্ষার মৌলিক পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে কি?" আরেক ব্যবহারকারী সুমাইয়া তাসনিম মন্তব্য করেন, "তারা একদিন দেশের ভবিষ্যৎ গড়বে। অথচ তাদের পরীক্ষার সময়ও নিরাপদ একটি শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।"

মো. জসিম উদ্দিন নামে একজন লেখেন, "ভাইরাল ভিডিও দেখে সাময়িক আলোচনা হবে। কিন্তু ভবনটি দ্রুত সংস্কার বা নতুন ভবনের কাজ শেষ না হলে আগামী বর্ষাতেও একই দৃশ্য দেখা যেতে পারে।" নুসরাত জাহান নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, "শিক্ষকদেরও কষ্ট হচ্ছে। তারা তো ইচ্ছা করে এমন পরিবেশে পরীক্ষা নিচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।"

স্থানীয়দের ভাষ্য, কোটখালী ফাজিল মাদ্রাসা এলাকার একটি পুরোনো ও পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে এখানে অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। নতুন ভবনের কাজ শুরু হওয়ায় কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও নির্মাণকাজের ধীরগতিতে হতাশা বাড়ছে। তাদের দাবি, কাজ দ্রুত শেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান করলেই হবে না। দেশের যেসব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পুরোনো ভবনে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর একটি জাতীয় পর্যায়ের অবকাঠামো নিরীক্ষা প্রয়োজন। কোথায় ছাদ ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় শ্রেণিকক্ষের সংকট, কোথায় ভবন সংস্কার জরুরি—এসব তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

একটি ভাইরাল ভিডিও কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু ভিডিওটির আড়ালে যে বাস্তবতা রয়েছে, সেটি অনেক গভীর। ছাতা মাথায় পরীক্ষা দেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর দৃশ্য শুধু একটি দিনের দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার এমন এক সংকটের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অবকাঠামোর ঘাটতি সরাসরি শিক্ষার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। নতুন ভবনের কাজ দ্রুত শেষ হওয়া এবং পুরোনো ভবনের ঝুঁকি দূর করার মধ্য দিয়েই এমন দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা অবকাঠামো

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250