রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** মক্কা চুক্তিতে যোগদানে কোনো ঝুঁকি দেখছে না ঢাকা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী *** সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ‘কানেকশন’ পাওয়ার দাবি চিফ প্রসিকিউটরের *** ভারত কি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যের পথে? *** সাবেক সেনাপ্রধান শফিউদ্দিনকে দুদকে তলব *** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম

‘সকালে সিদ্ধান্ত’, দুপুরে হামলা: ‘পীর’ হত্যায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদ

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ১১:৩০ অপরাহ্ন, ১১ই এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

গ্রামীণ পাকা সড়ক দিয়ে শতাধিক মানুষ জোরে হেঁটে যাচ্ছেন। এ সময় অনেকে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এর কয়েক মিনিট পর মিছিলকারীরা আস্তানায় পৌঁছে হামলা চালান। শুরু করেন ভাঙচুর। পাকা ঘরের ভেতর ঢুকে ভাঙচুর চালিয়ে ধরিয়ে দেন আগুন।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে আস্তানায় হামলা চালিয়ে এক ‘পীর’কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে এমন দৃশ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম শামীম রেজা জাহাঙ্গীর। তিনি ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা।

এ হামলার ঘটনায় আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ ও এক নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, শামীমের আস্তানায় প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গানবাজনা হয়। ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়। তখন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি আবার একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন।

স্থানীয় লোকজন বলেন, তিনি পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করে। বেশ কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, ৩০ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল থেকেই স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শনিবার সকালে শামীমের আস্তানা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট নামের এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, দুপুরের পর আস্তানায় হামলা চালানো হবে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, খবরটি স্থানীয় প্রশাসনসহ পুলিশ প্রশাসনের কাছে চলে যায়। সকাল থেকে সেখানে পুলিশও ছিল। জোহরের নামাজের পর এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থান থেকে বিভিন্ন বয়সী লোকজন লাঠিসোঁটা, রড ও হাঁসুয়া নিয়ে আস্তানার দিকে রওনা দেন। এরপর সেখানে গিয়ে হামলা চালান। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সেখানে তাণ্ডব চালানো হয়। আস্তানায় থাকা কয়েকজন আহত হন। অনেকে প্রাণ ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান শনিবার রাতে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, দুপুরে আহত অবস্থায় তিনজন ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে শামীম নামের ব্যক্তির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাকে কোপানো হয়েছে। চিকিৎসা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনি মারা যান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদের মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তারা শঙ্কামুক্ত।

পুলিশ জানায়, অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হলেও লোকজন এত বেশি ছিল যে পুলিশের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন সুখবর ডটকমকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ব্যক্তির (শামীম) একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তাতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া রয়েছে। কিন্তু ভিডিওটি অনেক আগের। ভিডিওটি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকার মানুষ সেখানে হামলা চালান। বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম ছিল। এ জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কারা কীভাবে ভিডিওটি নতুন করে সামনে নিয়ে এল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, আস্তানার পেছনের দিকে বাঁশবাগান। ধারণা করা হচ্ছে, পেছন থেকেই সহস্রাধিক মানুষ এসে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এত মানুষের হামলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।

ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ঘিরে নেটিজেনদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। একাংশ ঘটনাটিকে ‘ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে দেখলেও বড় একটি অংশ এটিকে সরাসরি ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি বলে নিন্দা জানিয়েছেন।

অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, যদি শামীম রেজার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকেই থাকে, তবে সেটি আইনের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত ছিল। “আইনের শাসন কোথায়?”—এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে অসংখ্য পোস্টে। কেউ কেউ লিখেছেন, “একটি পুরোনো ভিডিও ভাইরাল করে মানুষকে উত্তেজিত করে হত্যা করা—এটি পরিকল্পিত না স্বতঃস্ফূর্ত, তা তদন্ত হওয়া দরকার।”

মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা মনে করেন, আগাম তথ্য থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবুল হাসান নামে কুষ্টিয়ার এক বাসিন্দা লিখেছেন, “ভিডিও ভাইরাল হওয়া, সকালেই বৈঠক করে হামলার সিদ্ধান্ত, এরপর সংগঠিতভাবে আক্রমণ—সবকিছুই একটি বিপজ্জনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভাঙনের লক্ষণ।”

অন্যদিকে, কিছু পোস্টে দেখা গেছে উসকানিমূলক বক্তব্যও, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো বা বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রেও কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাৎক্ষণিক ক্ষোভ তৈরি করে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, “যে কোনো সংবেদনশীল ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ছড়ানো ভিডিও যাচাই না করে শেয়ার করা হলে তা মুহূর্তেই জনরোষে রূপ নিতে পারে।” তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য যাচাই ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া জরুরি।

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, শনিবার সকালে থেকেই প্রশাসন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিল। এলাকায় পুলিশও মোতায়েন ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও শতাধিক মানুষের মিছিল ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—“যদি সকালেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে দুপুরের আগে কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?” আবার কেউ কেউ বলছেন, জনতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা নজরদারি, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দ্রুত অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন—এসব পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারত।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শামীম সেখানকার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। পরে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জের এক পীরের মুরিদ হন এবং সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন। এ সময় থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে তিনি বিয়ে করলেও সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে নিজ বাড়িতে এসে পৈতৃক জমিতে ওই আস্তানা গড়ে তোলেন। ২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন শামীম। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তাকে দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কুষ্টিয়ার এ ঘটনাটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য, জনতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতির প্রশ্ন। একটি পুরোনো ভিডিও ঘিরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

নেটিজেনদের বড় একটি অংশ বলছেন, বিচারবহির্ভূত এমন হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের ভাষায়, “অভিযোগ থাকলে বিচার হবে আদালতে—মাঠে নয়।” একই সঙ্গে অনেকে জোর দিচ্ছেন, উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো এবং তা ব্যবহার করে সহিংসতা সংগঠনের পেছনের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা জরুরি।

আইনের শাসন, ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহ এবং জনতার আচরণ—এই তিনটির সংযোগস্থলেই দাঁড়িয়ে আছে কুষ্টিয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কতদূর এগোয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250