ফাইল ছবি
দেশে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ক্ষমতার কাঠামো থেকে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে তাদের দূরে রাখা হয়। নারীদের অধিকারের প্রশ্নে এলেই চাপ শুরু হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে, তবে নারী-পুরুষের সম–অধিকারের প্রশ্নে চিন্তার পরিবর্তন হয়নি। সম–অধিকারের দাবি যে শুধু নারীদের দাবি নয়, চিন্তার জায়গা থেকে, মননের জায়গা থেকে পুরুষকেই এই আলোচনাটা তুলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে ৫০ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিতে বাধ্য করতে হবে।
আজ রোববার (২৪শে আগস্ট) বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। নারী মুক্তি কেন্দ্র সেমিনারটি আয়োজন করে। সেমিনারের মূল দাবি ছিল সংসদে নারীদের ১০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
১৯৯৫ সালের আজকের দিনে দিনাজপুরে ইয়াসমিন নামের ১৪ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন কিছু বিপথগামী পুলিশ সদস্য। এ ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনে ফেটে পড়ে জনতা। তাদের ওপর নির্বিচার গুলি চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করে পুলিশ। তার পর থেকেই এ দিনটিকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ‘সম্মিলিত নারী সমাজ’।
সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, দেশে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ক্ষমতার কাঠামো থেকে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে তাদের দূরে রাখা হয়। এর ফলে সংখ্যার গুরুত্ব নিয়ে নারীরা জনপরিসরে হাজির হতে পারছেন না। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ’২৪–এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকলেও প্রতিটি আন্দোলনের পরই নারীদের পুরোনো জায়গায় ফিরে যেতে হয়েছে।
নারীদের খাঁচা ভেঙে রাস্তায় নেমে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, নারীদের বলা হয়েছে তাদের রাজনীতিতে আসার দরকার নেই। বড় বড় রাজনৈতিক দলে ৫ শতাংশও নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয় না। অথচ দেওয়া প্রয়োজন ৫০ শতাংশ। ঐকমত্য কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে ২০২৬–এর নির্বাচনে ৩০ শতাংশ এবং পরবর্তী নির্বাচনে ৫০ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিতে বাধ্য করা হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হলেও চিন্তার পরিবর্তন হয়নি বলে সেমিনারে মন্তব্য করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, নারীদের ক্ষমতায়নের, সম–অধিকারের দাবি যে শুধু নারীদের দাবি নয়, পুরুষেরও দাবি, এই আলোচনাটাই এখনো সামনে আসেনি। চিন্তার জায়গা থেকে, মননের জায়গা থেকে পুরুষকেই এই আলোচনাটাকে তুলতে হবে।
বিচার বিভাগের প্রসঙ্গ টেনে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ধর্ষণের শিকার নারীদের বিচারক বিরূপ মন্তব্য করছেন, আপস করার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিচারক কে আপস করতে বলার? এসব বিষয়ে বিচারকদের আরও সংবেদনশীল হতে হবে।
আইনজীবী আবেদা গুলরুখ বলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে কিন্তু মূল কাঠামো একটুও পরিবর্তন হয়নি। নারীদের সম–অধিকার নিশ্চিত হয়নি। এমনকি নারীদের জন্য যেটুকু অধিকার রয়েছে, তারও প্রয়োগ নেই।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত। তিনি বলেন, ’২৪ এর গণ-আন্দোলনে স্বৈরাচার পতনে নারীরা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু তারপরও নারীরা যখন নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত হতে চাইছেন, তখন তাদের সেই জায়গাতে অযোগ্য মনে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নারীদের সম্পর্কে রাষ্ট্রের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা যদি পরিবর্তন না হয়, তাহলে প্রতিকার পাওয়া যাবে না।
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নারী মুক্তি কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক তৌফিকা দেওয়ান। এ সময় আরও বক্তব্য দেন স্থপতি ফারহানা শারমিন, মিরনজিল্লা সিটি কলোনি ভূমি রক্ষা আন্দোলনের সদস্য পূজা রানী, অটোরিকশাচালক সাহিদা বেগম প্রমুখ। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন নারী মুক্তি কেন্দ্রের দপ্তর সম্পাদক সুস্মিতা রায়।
খবরটি শেয়ার করুন