ফাইল ছবি
দেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে ‘বিষফোঁড়া’ বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আশরাফ কায়সার। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে দেওয়া তার এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দেওয়া মন্তব্য হিসেবে দেখেছেন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জামায়াতের রাজনীতি, অতীত ভূমিকা এবং বর্তমান অবস্থান নিয়ে দেশে বিতর্ক নতুন নয়; বরং স্বাধীনতার পর থেকেই দলটি বারবার জনআলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
টকশোতে আশরাফ কায়সার বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত একটি ‘বিষফোঁড়া’। তার ভাষ্য, দলটি বাংলাদেশকে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় এবং নারী অধিকার ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে তাদের অবস্থান বিতর্কিত। তিনি আরও দাবি করেন, পাকিস্তানে জামায়াতের ইতিহাস এবং দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ধর্মের সঙ্গে জামায়াতের আদৌ কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয় হতে পারে।
আশরাফ কায়সারের এ মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। কেউ তার বক্তব্যকে সাহসী ও সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেন, আবার কেউ এটিকে একপাক্ষিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেন। ফলে আবারও সামনে আসে প্রশ্ন—দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থান আসলে কোথায়?
জামায়াতের ইতিহাস দীর্ঘ ও বিতর্কে পরিপূর্ণ। দলটির শিকড় অবিভক্ত ভারত এবং পরে পাকিস্তানের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দলটি নিষিদ্ধ হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে। এরপর সংসদ নির্বাচন, জোট রাজনীতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোট জামায়াতকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সরকারে দলটির কয়েকজন নেতা মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে দলটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতার বিচার হয়। কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় এবং কয়েকজন কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। এসব বিচারকে কেন্দ্র করে দেশে যেমন সমর্থন তৈরি হয়েছিল, তেমনি সমালোচনাও ছিল। তবে এসব ঘটনার পর জামায়াতের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরে আদালতের রায়ের পর নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়। ফলে দলটি নিজস্ব প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী বা অন্য রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলটি আবারও সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের চেষ্টা করছে এবং প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতকে ঘিরে বিতর্কের একটি বড় কারণ হলো দলটির আদর্শিক অবস্থান। দলটি ইসলামভিত্তিক রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিলেও সমালোচকদের অভিযোগ, তারা ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। অন্যদিকে জামায়াতের দাবি, তারা ইসলামের ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত শাসন এবং কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতি করে। দলটির নেতারা বারবার বলে আসছেন, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করে, রাজনীতিতে জামায়াতকে মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের পরিবর্তে ইতিহাস, আইন এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি একটি রাজনৈতিক দলের বর্তমান কার্যক্রম ও জনসমর্থনও বিশ্লেষণের বাইরে রাখা উচিত নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আশরাফ কায়সারের বক্তব্য নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট। রাহাত ইসলাম নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইতিহাসের দায় থেকে কোনো দলই মুক্ত নয়। অতীত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার আছে।” মেহেদী হাসান নামের আরেকজন মন্তব্য করেন, “কোনো রাজনৈতিক দলকে সমালোচনা করা যেতে পারে, তবে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।” সাবিহা নওরীন নামের একজন লেখেন, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শগত বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু সেটি যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষে পরিণত না হয়।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের রাজনীতিতে মেরুকরণ যত বাড়ছে, জামায়াতকে ঘিরে বিতর্কও তত তীব্র হচ্ছে। একদিকে দলটির অতীত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে বর্তমান রাজনীতিতে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা—দুই বিষয়ই আলোচনায় রয়েছে। ফলে দলটিকে নিয়ে কোনো মন্তব্য সামনে এলেই তা দ্রুত জনআলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
আশরাফ কায়সারের বক্তব্যও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। তার মন্তব্যের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন। তবে এ ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, আদর্শ, ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত বিতর্কের বিষয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা যেদিকেই মোড় নিক, দলটিকে ঘিরে আলোচনা ও মতভেদ যে অদূর ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, সেটি বলাই যায়।
খবরটি শেয়ার করুন