ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান হামলা নিয়ে ইসরাইলের কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা এখন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা যুদ্ধ থেকে পিছু হটার সম্ভাব্য পথ বা এক্সিট র্যাম্প খুঁজছেন। এই যুদ্ধ অঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য আরও ক্ষতিকর হওয়ার আগেই থামানো দরকার বলে তারা মনে করছেন। সূত্র- ওয়াশিংটন পোস্ট।
যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। হামলা থামানো বা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। তিনি এখনো সম্পূর্ণ জয় তুলে নেওয়ার লক্ষ্যে অটল আছেন। রোববার (৮ই মার্চ) টেলিফোনে ওয়াশিংটন পোস্টের কথা হয় ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনা ও কৌশল সম্পর্কে জানা এক সিনিয়র ইসরাইলি কর্মকর্তার সঙ্গে। পরিস্থিতির স্পর্শকাতরতার কারণে তিনি নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন। প্রথমে তিনি ইরান সরকারের নমনীয় সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন। কারণ হিসেবে বলেছেন, তার পছন্দের আলোচনার অংশীদাররা এখন আর বেঁচে নেই। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও শনিবার বলেছেন তিনি ‘মোমেন্ট অফ ট্রুথ’ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে চান।
আলোচনার বিরুদ্ধে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই কঠোর অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে। কারণ রোববার ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ছেলে। তিনি কট্টরপন্থী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে তার বাবার চেয়েও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আলোচনার টেবিলে বসার মানুষ নন।
ওই ইসরাইলি কর্মকর্তা ও তার মতো আরও অনেকের উদ্বেগের কারণ হলো যুদ্ধের বাড়তে থাকা খরচ। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হচ্ছে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর ট্রাম্প নিজেও জনসমর্থন ছাড়াই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। ওই ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেন, ‘শাসন উৎখাত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াটা আমাদের স্বার্থে কি না তা নিশ্চিত নই। কেউ অনির্দিষ্টকাল ধরে যুদ্ধের ময়দানে থাকতে চায় না।’
তিনি জানান, ইসরাইল ও আমেরিকার বোমা হামলা তার সামরিক লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি এসে গেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্ট অংশ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব ধ্বংস করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা শাসন উৎখাত চাই, কিন্তু এটাই একমাত্র সমাপ্তি নয়।’ প্রধান সামরিক লক্ষ্যগুলো ধ্বংস হলে ‘ইসরাইল তার লক্ষ্য অর্জন করবে’ বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। তিনি আরও বলেন, ‘ইরান আত্মসমর্পণ করবে না, কিন্তু মার্কিন শর্তে যুদ্ধবিরতি মানতে রাজি হওয়ার বার্তা দিতে পারে।’
তবে এই কর্মকর্তা নেতানিয়াহুর হয়ে কথা বলছেন না। নেতানিয়াহু রোববার বলেছেন, যুদ্ধের পরের ধাপে ইসরাইল ইরানের শাসনকে ‘অস্থিতিশীল করতে এবং পরিবর্তন সম্ভব করতে’ চায়। তবে ওই কর্মকর্তার মত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশের মনোভাব প্রকাশ করে বলে মনে হচ্ছে। এই অংশটি গাজায় স্পষ্ট পরিণতি ছাড়াই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তে হতাশ হয়েছিল এবং তার কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে সন্দিহান।
তিনি বলেন, ‘শাসনকে কে প্রতিস্থাপন করবে তা আমরা দেখব না।’ কুর্দি বা অন্য সংখ্যালঘুদের অস্ত্র দেওয়া ভালো কৌশল হবে না বলে তিনি মনে করেন, কারণ তাতে ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের আরও দুটি উদ্বেগ রয়েছে। একটি হলো লেবাননে বড় স্থলঅভিযানের ঝুঁকি। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কাদায় আটকে যেতে চাই না।’ ইসরাইলের উত্তর সীমান্তের কাছে হিজবুল্লাহর বাকি অংশ ধ্বংস করতে ইসরাইলি স্থলসেনা লেবাননে আছে, কিন্তু ‘বড় স্থলঅভিযানের পরিকল্পনা নেই’ বলে তিনি জানান।
তিনি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামসহ লেবানিজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে পৌঁছানোর আগ্রহের কথাও জানান।
দ্বিতীয় উদ্বেগ হলো আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক। দুই দলের আমেরিকানরাই এই জোট নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তহীন যুদ্ধে টেনে নামাব না।’ ইসরাইল একটি ‘নির্ভরযোগ্য মিত্র’, বোঝা নয় — এটাই তার যুক্তি।
এদিকে ট্রাম্প ইরানের শাসন ধ্বংসের পথেই এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একটি নতুন ইরান গড়ার স্বপ্নের কথা বলছেন। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তার কাছে নেই। ইরাক যুদ্ধের সময় যে প্রশ্নটি উঠেছিল সেটিই এখন আবার শোনা যাচ্ছে — এই যুদ্ধ শেষ হবে কীভাবে?
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন